টোটবিকো লোইকো দেরেং
টোটোদের গ্রামের খবর
টোটো-বাংলা পত্রিকা
ত্রয়োদশ সংখ্যা
সম্পাদক- ভক্ত টোটো
টোটো সমাজে সত্যজিৎ টোটোর অবদান
সমাজে এমন কিছু কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করেন, যারা সমাজের বুকে কিছু না কিছু ছাপ ফেলে রেখে যান। তাঁদের কথা মানুষ মনে রাখে, তাঁরা চির-স্মরণীয় হয়ে থাকেন। কোথাও না কোথাও কোনো ঘটনা বা অনুষ্ঠান তাঁদের আবার জীবিত করে তোলে। তাঁরা সমাজের বুকে অমর হয়ে থেকে যান। তাঁরা সমাজের একঘেয়ে জীবনযাত্রা এবং অন্ধকারময় সময়কে নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল করে তোলেন। তাঁরা সমাজের জন্য এমন কিছু করে যান যাতে সমাজের নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা নতুন কিছু শিক্ষা, প্রেরণা আর চেতনা লাভ করতে পারে।
জীবনে অনেক দুঃখকষ্ট, বাধাবিঘ্ন, অভাব-অনটন তাঁদের কাছে কোনোকিছুই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তাঁরা অন্ধকারময় সমাজে থেকেও সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন করে স্বপ্ন দেখেন। নতুন কিছু গড়তে শেখান, ভাবতে শেখান। যাঁদের জাতির প্রতি, দেশের প্রতি ভালোবাসা, নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা, আন্তরিকতা থাকে, তাঁদের পক্ষেই এই সমস্ত কাজ করা সম্ভব।
ভারতের একটি সংখ্যালঘু আদিম জনজাতি টোটো সম্প্রদায়ের মধ্যেও এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যাঁর কথা না লিখলে হয় না। তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই। রয়ে গেছে শুধু স্মৃতি আর তাঁর অবদান। টোটো সমাজে তিনি একজন অভাবনীয় ব্যক্তি। তিনি মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে অকালমৃত্যু বরণ করেন। বিগত ১৫.০৯.২০২২ তারিখে নিজের বাড়িতে প্রায় বিনা চিকিৎসায় তিনি মারা যান। তিনি হলেন সত্যজিৎ টোটো। তিনি ছিলেন টোটো যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন সাহিত্যকার (লেখক, কবি, গল্পকার ও গায়ক)। তিনি বাংলা অক্ষরে টোটো এবং বাংলা গান, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লিখতেন। বাড়ির লোকজন, পাড়া প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জানা গেল যে মৃত্যুর আগে তার পেটে আর বুকে ব্যথা ছিল। জীবিত থাকা কালীনও মাঝে মাঝে শারীরিক অসুবিধায় ভুগত। চিকিৎসা করানোর পর আবার ঠিক হয়ে যেত।
সত্যজিতের মৃত্যুর পর বাড়িতে রয়ে গেছেন তাঁর স্ত্রী রীতা টোটো, চল্লিশ বছর বয়সী। একমাত্র পুত্রসন্তান বাইশ বছর বয়সী বিদ্রোহ টোটো। আর রয়েছে কন্যা সন্তান সতের বছর বয়সী বিশাখা টোটো। তারা দুই ভাই-বোন খুব কষ্টের মধ্যে লেখাপড়া করে যাচ্ছে। কষ্টের মধ্যেও লেখাপড়া করে তারাও ভবিষ্যতে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
রীতার একটা ছোট্ট দোকান আছে। ঐ দোকানের উপর নির্ভর করে সংসার আর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে হয়। এছাড়াও রয়েছে কিছু জায়গাজমি, অল্প কিছু সুপারি বাগান। সুপারি বাগান থেকে বছরে কিছু টাকা আয় হয়। কোনো কোনো বছরে আবার টাকা আগাম নিয়ে খরচ করতে বাধ্য হয়। তাতে সুপারি বাজারের মূল্য থেকে কম দামে বিক্রি করতে হয়।
পরিবারের মধ্যে সবার বড় ছিলেন সত্যজিৎ টোটো। তাঁরা ছিলেন চার ভাই আর চার বোন। মেজ ভাই অবজিৎ, সেজ ভাই রণজিৎ, আর সবার ছোট ভাই চিরঞ্জিৎ টোটো। ভাইদের মধ্যে বেঁচে আছেন সেজ ভাই রণজিৎ টোটো, তাঁর বয়স এখন চল্লিশ বছর। তিনি এখন দেবেন্দ্র পাঠাগার, রাঙ্গালি বাজনা, মাদারিহাট, আলিপুরদুয়ারে কর্মরত। মাঝে মাঝে টোটোপাড়া রুরাল লাইব্রেরিতেও কাজ করতে হয়। বাকি ভাইয়েরা কয়েক বছর আগেই পরলোক গমন করেছেন।
বোনেদের মধ্যে রয়েছেন রাধা (৩৩), সুভদ্রা (৩০), সুজাতা (২৭) আর সিমা টোটো (২৪)। এরা প্রত্যেকে বিবাহিত। রাধার বিয়ে হয়েছে সিকিম-এর এক নেপালি যুবকের সাথে। সুভদ্রার বিয়ে হয়েছে টোটোপাড়াতেই এক টোটো যুবকের সাথে। সুজাতারও এক টোটো ছেলের সাথে টোটোপাড়াতেই বিয়ে হয়েছে। সবার শেষের বোন সিমা-র বিয়ে হয়েছে শামুকতলা, বানিয়া গাঁও, আলিপুরদুয়ার নিবাসী এক সাঁওতাল ছেলের সাথে।
সত্যজিৎ টোটো-র বাবা ছিলেন দাংত্রবি গোত্রের, পঞ্চায়েত গাঁও, আর মা ছিলেন বোঙ্গবি গোত্রের, মিত্রাং গাঁও। বাবা মুক্তারাম টোটো আর মা সবিতা টোটো-র কোলে একটা ছোট্ট দেংসা (টোটোদের পুরোনো ঘর)-তে একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে। জন্ম তারিখ ছিল ২৮.১০.১৯৭৯। বাবা মুক্তারাম টোটো একজন শিক্ষিত ও সরকারী কর্মচারী ছিলেন। তাই আদর করে ছেলের নাম রেখেছিলেন সত্যজিৎ। সেদিন বাবা ভাবতে পারেননি ছেলে একদিন টোটো সমাজের টোটো ভাষার লেখক, গায়ক, কবি, প্রবন্ধকার হয়ে উঠবে। মুক্তারাম টোটো টোটো-জনজাতির মধ্যে সর্বপ্রথম (১৯৭৫ সাল, জমাদার বোস জুনিয়র হাইস্কুল, দিনহাটা, কুচবিহার থেকে) অষ্টম শ্রেণি পাশ ব্যক্তি ছিলেন। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেকার ঘটনা। ১৯৮২ সালে টোটোপাড়াতে Totopara Rural Library-তে লাইব্রেরিয়ান পদে সরাসরি নিযুক্ত হয়েছিলেন। চাকরিজীবী সরকারী কর্মচারী হলেও তিনি বাড়িতে বেশি সময় দিতে পারতেন না। কেননা তিনি একটি বামপন্থী রাজনৈতিক দলের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। স্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব তাঁর উপরে ছিল।
অন্যান্য সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েদের মতোই সত্যজিতের লেখাপড়া শুরু হয় টোটোপাড়া বোর্ড ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে। শুরুতেই বাংলা মাধ্যম। সেই সময় অবশ্য টোটোপাড়াতে বাংলা ভাষা চালু ছিল। প্রাইমারি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণি উত্তীর্ণ হবার পর সত্যজিৎ টোটো স্থানীয় ধনপতি টোটো মেমোরিয়াল জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি হন। সেখানে ভালোভাবেই লেখাপড়া চলতে থাকে। স্কুলে বন্ধুবান্ধবদের সাথে মেলামেশা ভালো ছিল। বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়ে ছিল। যেমন: টোটো, নেপালি, বিহারী, উরাও, মেচ, ইত্যাদি।
ধনপতি মেমোরিয়াল জুনিয়র হাইস্কুলে পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির পড়াশোনা করেন। ষষ্ঠ শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়ার পর ছোট শালকুমার গ্রামে বীর বিরসা মুণ্ডা হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ঐ স্কুলে ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা ছিল। বিশেষ করে তপশিলি জাতি, জনজাতির ছেলেরা ওখানে থেকে পড়াশোনা করতে পারত। সরকারি অনুদানের উপর খাওয়া-দাওয়ার সুবিধা ছিল। সরকারি অনুদান পেতে দেরী হলে ছাত্রদের বাড়ি থেকেই টাকা দিতে হতো। ছাত্রাবাসে প্রথম দিকে ভালোই চলছিল, কিন্তু পরবর্তীতে টাকা-পয়সার সমস্যা শুরু হলো। টিফিনের খরচ, বইখাতাপত্র কেনা, পোশাকাদি এমনকি মাসিক খাবারের টাকার জন্য ভীষণভাবে সমস্যা শুরু হলো। তাই মাঝেমাঝে টাকাপয়সার জন্য স্কুল-হস্টেল ছেড়ে বাড়িতে আসতে হতো। বাড়িতে এসে ঠিকমতো টাকা না পেলে মন খারাপ হতো। বাড়িতে এসে আবার বাবা-মা-য়ের বকুনি খেতো। তবুও সে নাছোড়বান্দা। কষ্ট সহ্য করে পড়াশোনা করতে থাকে। বিরসা হাইস্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণি পাস করে। তারপর পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে সে আর পড়াশোনা করতে পারেনি। তবে বিভিন্ন গল্পের বই পড়ার অভ্যাস তার ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে জানার খুব আগ্রহ ছিল।
পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বাড়িতে কাজকর্ম করা, বন্ধুবান্ধবদের সাথে স্কুল-মাঠে খেলাধুলো করা, সবাই মিলে একসাথে কাজ করা। কমলার মরশুমে ভুটান থেকে কমলা বয়ে নিয়ে আসা বা ভুটানে থেকে কমলা পাড়ার কাজ করা। এর পাশাপাশি বয়স্ক টোটো শিল্পীদের সাথে টোটো নাচগানে অংশগ্রহণ করা, নাচগান শেখা, ইত্যাদি।
এইভাবে কাজ করতে করতে সত্যজিৎ একসময় পূর্ণ যৌবনে পরিণত হয়। শুরু হয় প্রেমপর্ব। গ্রামেরই একটি খুব গরিব পরিবারের মেয়ে রীতা টোটো-কে সে ভালোবেসে ফেলে। পরে বাবা-মা-ও জানতে পারে। মেয়েটিকে বাবা-মা-য়েরও পছন্দ হয়ে যায়। রীতার বাবা গাবুরা আর মা বাসন্তি টোটো খুবই গরিব এবং দিনমজুর ছিল। দুইজনেই আর বেঁচে নেই। এইভাবে বাবা-মা-এর পছন্দমতো তাদের বিয়ে হয়। সংসার চলতে থাকে। তিনি দৈনিক মজুরের কাজ করতেন, ছোটো ছোটো ঠিকার কাজও করতেন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভুটান থেকে কাজের ডাক পেলে সেখানে দলবল নিয়ে চলে যেতেন। কাজের দলের মধ্যে থাকত পাঁচ থেকে দশ-বারো-জন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি টোটো ভাষায় গান লিখতেন আর সুর দিতেন। নিজে শিখতেন আর কাজের বন্ধুদেরও শেখাতেন। ভুটান পাসাখা-তে কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি গান লিখেছিলেন। গানটি এরকম: জরাকো আবিতা টেরবো টেরবো সা, দ্যাম্যাকাং ইয়াঘএ, মাঁব্যাকাং ইয়াঘএ, প্যাকোতা টেরবো টেরবো সা। এর বাংলা অর্থ: পাহাড়ের ধারে বড় বড় বাড়ি, এপারে পাহাড়, ওপারে পাহাড়।
তিনি বয়স্ক টোটো শিল্পীদের সাথে নাচগানে অংশগ্রহণ করতেন, শেখার চেষ্টা করতেন। টোটোপাড়ার বাইরে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিল্পীদের নিয়ে যেতেন। টোটো সংস্কৃতির নাচগানের সাথে তাঁর নিজের রচিত গান, কবিতা পরিবেশন করতেন। তিনি টোটো সমাজের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের নতুন অধ্যায় দিয়ে গেছেন। বর্তমানে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে অভিষেক টোটো, শনে টোটো, ভরত টোটো, আর তাদের সাথে জড়িত অন্যান্য ছেলেমেয়েরা।
সত্যজিৎ টোটোর টোটো ভাষায় লেখা কয়েকটি গানের মধ্যে রয়েছে:
হিংকে হিংকে, পাসাখাতা টেরবো টেরবো সা, দাংতা কাং হিশপা, মাংতা কাং চুংচা, ইত্যাদি। আরো রয়েছে অনেক কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, টোটো ভাষার শব্দভাণ্ডার। টোটো সমাজের কাছে তাঁর একটি করুণ আবেদন রেখে গিয়েছিলেন, সেটি হলো যে: টোটোরা যেন নিজের ভাষা ভুলে না যায়, তারা যেন বাড়ির ভিতরে ও বাইরে যে-কোনো কাজে নিজেদের ভাষায় কথা বলে। তাঁর এই আবেদনের মূল উদ্দেশ্য হলো টোটো ভাষাকে কথাবার্তায় চর্চার মধ্যে রাখা, সাথে সাথে টোটো ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা। কেননা ভাষা আর সংস্কৃতি প্রত্যেক জাতির একটি পরিচয়।
তিনি ‘টোটবিকো লোইকো দেরেং’ পত্রিকাটি ২০১৮ সালের ১৮-ই এপ্রিল তারিখে টোটোপাড়া বাজারে উদ্বোধন করেন, উক্ত অনুষ্ঠানে স্থানীয় কিছু গুণী ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সকলে পত্রিকাটির শুভকামনা করেছিলেন। পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকে পঞ্চম সংখ্যা পর্যন্ত তাঁর নিজের সম্পাদনা করা। প্রথম থেকে পঞ্চম সংখ্যার মধ্যে তাঁর টোটো ভাষায় লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, গান, টোটা ভাষার শব্দভাণ্ডার রয়েছে। পত্রিকাটি চালু করার অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন বিপ্লব নায়ক, কলকাতা, মাতৃভাষা-র প্রকাশক, লেখক। টোটোপাড়া নিয়ে বিপ্লব নায়ক, ধনীরাম টোটো এবং সত্যজিৎ টোটো-র যৌথভাবে লেখা বই রয়েছে।
অবশেষে এটা বলতেই হবে যে, সত্যজিৎ টোটো ব্যক্তি যে-ই হোন না কেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি যা সাহিত্য রচনা করে গেছেন তা অবশ্যই আগামী দিনে টোটো সমাজে একটি ইতিহাস তৈরি করবে। তাঁর এই ধরনের অবদানের জন্য টোটো জনজাতি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। সত্যজিৎ টোটো একজন সাহিত্যকার হিসেবে টোটো সমাজে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ভক্ত টোটো

