Banner Image Courtesy: www.boredpanda.com
শিশুদের আগ্রহে জীবজন্তু বরাবরই প্রথম সারিতে। তার বর্ণপরিচয়-ই শুরু হয় পশুপাখির নাম ধরে। এ হেন আগ্রহের বিষয়কে বাংলা শিশুপাঠ্যে (primer) নিয়ে আসার একটা প্রয়াস এসেছিল ঊনিশ শতকের নব্যবঙ্গীয় শিক্ষিত একদল যুবকের থেকে। বঙ্গসংস্কৃতিতে যাঁরা পরিচিত ছিলেন ইয়ংবেঙ্গল নামে। পাশ্চাত্য শিক্ষা, বিজ্ঞানচিন্তা, অনুবাদ সংস্কৃতি এসবের সঙ্গে শিশুপাঠ্য বিষয়কে একস্রোতে মিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তাঁরা।
হিন্দু কলেজজাত ইয়ংবেঙ্গল দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন রামচন্দ্র মিত্র। তিনি ছিলেন হিন্দু কলেজের শিক্ষক। দেশ-বিদেশের জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাঁর অপরিসীম আগ্রহ ছিল। তাঁর সম্পাদিত দ্বিভাষিক গ্রন্থ পশ্বাবলি। ১৮২২ সালে স্কুল বুক সোসাইটি থেকে এটি প্রকাশিত হয়। এর প্রথম পর্যায়ের সম্পাদক ছিলেন ডব্লু.এইচ. পিয়র্স এবং জন লসন। দ্বিতীয় পর্যায়ে পশ্বাবলী-র সম্পাদনাকর্ম আসে রামচন্দ্র মিত্রের হাতে। এটিই ছিল শিশুদের জন্য লিখিত কোনো বাঙালি সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা (Periodical)।
কি আছে পশ্বাবলি-তে
১৮৩৪ সালের ২ অক্টোবর জ্ঞানান্বেষণ পত্রিকা-য় পশ্বাবলি-র দ্বিতীয় খণ্ড সম্পর্কিত একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে এটি সম্পর্কে উচ্চ প্রশংসাসহ লেখা হয়েছিল,
পশ্বাবলি।— শ্রীযুক্ত রামচন্দ্র [মিত্র] বাবু কর্ত্তৃক কৃত এক পশ্বাবলি নামক গ্রন্থ তাহার দ্বিতীয় খণ্ডের প্রথমাংশ যে আমারদিগের প্রতি প্রেরণ করিয়াছেন ঐ গ্রন্থ ইংরেজী হইতে সংক্ষেপ করিয়া ইঙ্গরেজী অক্ষরে ও বাংলা অক্ষরে অনুবাদ করিয়াছেন এবং তাহাতে পশুদিগের ইতিহাস ও উত্তম আহ্লাদজনক বিবরণ আছে উক্ত গ্রন্থ পাঠ করিয়া আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হইয়াছি।
জ্ঞানান্বেষণ-এ প্রকাশিত সংবাদ আমাদের বলে দেয় পশ্বাবলি পশুদের বিবরণ সংক্রান্ত গ্রন্থ। এতে শিশুদের উপযোগী করে লেখা বিভিন্ন পশু সংক্রান্ত বিবরণ, তাদের আকৃতি-প্রকৃতি, স্বভাব, প্রজাতি ইত্যাদি নানা সাহিত্যরসমৃদ্ধ বিবরণ আছে। এক এক খণ্ডে আছে এক এক পশুর বর্ণনা। কুকুর, ঘোড়া, গাধা, মহিষ, ভেড়া, ছাগল, উট, শীলমাছ ইত্যাদি সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি প্রতিটি খণ্ডের শুরুতে সংশ্লিষ্ট পশুর একটি ছবি, সেই পশুর স্বভাব বিবরণমূলক একটি কবিতা (ইংরেজি ও বাংলা) দেওয়া থাকতো। জন লসন ধাতু খোদাই ও কাঠ খোদাই ব্লক তৈরীতে বিশেষ অভিজ্ঞ ছিলেন। ছাত্রদের ভালোলাগার কথা মনে রেখে প্রথম পর্যায়ে পশুর ছবি দেওয়া ব্লক তৈরি করেছিলেন পশ্বাবলি-তে ছাপানোর জন্য। পরের দিকে লসনের মৃত্যুর পর কে ব্লক তৈরি করতেন সেকথা অবশ্য জানা যায় না। সেদিক থেকে পশ্বাবলি-ই ছিল প্রথম সচিত্র পত্রিকা। এছাড়াও থাকত সেই পশু সম্পর্কে এক বা একাধিক উপাখ্যান।
পশু-র কবিতা
পশ্বাবলি-তে সংযোজিত ইংরেজি কবিতাগুলি লিখেছিলেন জন লসন। পরে রামচন্দ্র মিত্র সেগুলির বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। যেমন, (কুকুর) খণ্ডে,
The Dog :
Of all the speechless friend of man
The faithful dog [I] deem
Deserving from human clan
The [tenderest] esteem
রামচন্দ্র মিত্র এর বাংলা করেন,
পশু মধ্যে যত বন্ধু আছে মানবের
কেহ তুল্য হয় না কৃতজ্ঞ কুক্কুরের
এই হেতু বোধ করি মনুষ্য হইতে
উপযুক্ত হয় অধিক স্নেহ পাইতে।।
আবার অনেকগুলো খণ্ডে শুধু বাংলা কবিতা। সেসব কবিতা পাঠ করলে লেখকের স্বতস্ফুর্ত কবিত্বের সঙ্গে বাঙালিজাতি সুলভ কৌতুকবোধটি চোখে পড়ে। যেমন ছাগল [part II – vol- VII] খণ্ডে,
The Goat :
ছাগল শরল জাতি উপকারি হয়।
কিঞ্চিৎ করিলে স্নেহ বশ্যভাবে রয়।।
অহিংসক ছাগ কারু অপকারি নয়।
কে কোথা ছাগল দেখে পাইয়াছে ভয়।।
তাহারা কেমন হিঁদু হায় হায় হায়।।
পশু-র বৃত্তান্ত
পশ্বাবলি-তে পশুদের যে কেবল আকার-স্বভাব-প্রজাতি ইত্যাদির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিজ্ঞানসম্মত বিবরণ আছে, তাই নয় পর্যবেক্ষণসাপেক্ষ সরস পরিবেশনভঙ্গীটিও লক্ষ্য করবার মতন। পশুবিজ্ঞানের সঙ্গে এসে মিলেছে সাহিত্যিকের অন্তরঙ্গ অনুভব। যেমন কুকুরের বৃত্তান্তে, কুক্কুরের সম্মুখ দন্ত যে সকল আছে তাহার মধ্যে উপরে ছয়টা ও নীচে ছয়টা। পার্শ্বের দন্ত সকল লম্বা ও বিরল; গজদন্তগুলা বিরল ও বক্র; চর্ব্বণের দন্ত ছয় কিম্বা সাতটা। … আপন প্রভুর আগমন দেখিলে আনন্দে লম্পন করিতে থাকে, কেহ তাহার প্রভুকে মারিলে সে তাহা সহ্য করিতে পারে না। … কুক্কুর যাচ্ঞা করিতে পারে এবং কোন দ্রব্য চুরি করিয়া প্রভুর ভয়ে ভীত হইয়া আপন লাঙ্গুল দুই পদের নীচে গুজিয়া রাখে।
এইরকম বৃত্তান্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পশু সংক্রান্ত নানা কিংবদন্তী উপাখ্যানও যুক্ত হয়েছিল। এর ফলে পশ্বাবলি কেবল তথ্যকণ্টকিত নীরস বিজ্ঞান গ্রন্থে পরিণত হয়নি। এর মধ্যে এসেছে শিশুপাঠ্য সাহিত্যের আস্বাদও। বলা বাহুল্য ফিয়র্স এবং লসন সংগৃহিত উপাখ্যানগুলি রামচন্দ্র মিত্রের অনুবাদে অনবদ্য হয়ে উঠেছিল। যেমন ঘোড়ার বৃত্তান্তে এক ব্যক্তির একটি টাট্টু ঘোড়ার কাহিনি আছে। সেই ব্যক্তির পোষ্য টাট্টুর সঙ্গে পোষ্য কুকুরের এমন বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল যে, একটি বড় কুকুর তার পোষা কুকুরটিকে আক্রমণ করলে টাট্টুটি সামনের পা তুলে অদ্ভুত উপায়ে বাইরের কুকুরটিকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিল। বন্ধুত্বের চিহ্নস্বরূপ এরপর তারা একে অপরের রক্ষক হিসেবে আবদ্ধ ছিল। এই বৃত্তান্তটি ছাড়াও ঘোড়া বিষয়ক আরও চোদ্দটি উপাখ্যান এতে ছিল। তেমনি কুকুরের বৃত্তান্তে আছে আঠারোটি উপাখ্যান, গর্দভের বৃত্তান্তে আছে চোদ্দটি উপাখ্যান, ছʼটি উপাখ্যান আছে মহিষের বৃত্তান্তে, ভেড়া ও ছাগলের বৃত্তান্তে সংযুক্ত হয়েছে দুʼটি ও পাঁচটি করে উপাখ্যান।
রামচন্দ্র মিত্রের সম্পাদিত পশ্বাবলি-র বৈশিষ্ট হল এতে জীববিজ্ঞান সাহিত্যের হাত ধরে এসে মিলেছে। পশুপাখির বিজ্ঞানসম্মত বিবরণ এবং সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিয়ে রচিত নানান গল্পগাথা, দেশ বিদেশের গ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন সম্পাদকরা। ঊনিশ শতকের প্রধমার্ধে বাঙালি শিশুর হাতে আসা এ হেন উপহার একদিক থেকে শিক্ষাপদ্ধতিকে যেমন আকর্ষনীয় করে তুলেছিল তেমনি আবার নিঃসন্দেহে অনুবাদ সংস্কৃতিকেও পরিপুষ্টি দান করেছিল। ইয়ংবেঙ্গলদের পাশ্চাত্য সাহিত্য সংস্কৃতিচর্চায় এরকম নানাভাবে বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতিকে পুষ্ট করেছিল। পশ্বাবলি তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
Friday, Sept 10, 2021
কস্তূরি মুখোপাধ্যায়

