হাফ-মফস্বলীর নগর-দর্শন

পড়া মানেই জানা, এ আর কে না জানে! পড়া সবসময় সহজে পৃথিবীকে বড় করে। বাড়ি, স্কুল আর বাড়ির সামনে খেলার মাঠ, এই ছিল আমাদের প্রাইমারি স্কুলের পৃথিবী। পাকা রাস্তা, মানে পিচের রাস্তা, মানেই দুঃসাহস, সেই বয়সে। পাকা রাস্তা ধরে একটু একটু করে তুমি এগোতে পারছ মানেই তুমি বড় হচ্ছ। আমাদের যাদের বাড়ি বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে এবং কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ কিঞ্চিৎ দুস্তর, তাদের কাছে কলকাতা বিদেশ, বিস্ময় ও বিলাস। কেমন? কেউ কলকাতায় একবার গেলে, ইনিয়ে-বিনিয়ে সেই গল্প বলেই যেত, সেই গল্প যে শুনত সে আবার ইনিয়ে-বিনিয়ে সেই কলকাতার গল্প এই অহংকার ও কর্তৃত্ব থেকে বলত যে, সে এমন একজনকে চেনে যে কলকাতায় গেছে। কলকাতায় কারও আত্মীয় থাকলে সে তো নবাব (সেলিব্রিটি বলছি না, কারণ যে সময়ের কথা বলছি সেই সময় সেলিব্রিটি সহজলভ্য বিষয় ছিল না)। তাছাড়া বেসরকারী চ্যানেল ও সিরিয়াল তেমন না থাকায় সেলিব্রিটির সংখ্যাও ছিল নিতান্তই কম।

নিকটবর্তী রেলস্টেশন আমাদের বাড়ি থেকে পঁচাশি কিলোমিটার দূরে প্রায় তিন ঘণ্টার বাস তারপর ট্রেন ধরে কলকাতা। এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে, অর্থাৎ কলকাতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ট্রেন যোগাযোগ না থাকা, কলকাতায় পৌঁছনো একটা ব্যাপার ছিল তো বটেই। বাবার কাছে শুনেছিলাম যখন কলকাতা থেকে আমাদের ঐ হাফ-মফস্বলে প্রথম সরকারি বাস এলো, সেদিন দূর দূর গ্রাম থেকে সব যুবকরা সাইকেলে করে সেই বাস দেখতে গিয়েছিল। সেই সময়ের বিধায়ক নৈলক্ষ্য সান্যাল প্রথম সরকারি বাসে চেপে কলকাতায় গিয়েছিলেন। সে এক বিস্তর আলোচনার বিষয়। গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমরা যখন স্কুল পেরোচ্ছি সেই সময় প্রায় চার-পাঁচটা বেসরকারি বাস শুরু হয়ে যায় কলকাতা যাওয়ার জন্য। ফলত প্রতিদিনের কাজে কলকাতার সঙ্গে সংযোগ বাড়তে থাকে অনেক মানুষের। যে কাজটার জন্য কৃষ্ণনগর বা বহরমপুর যেতে হত সেই কাজটার জন্য শুরু হল কলকাতা যাওয়া। সঙ্গে উপরি পাওনা কলকাতা দর্শন। ফিরে এসে সেসব গপ্পো।

আমি তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। বাংলা সিনেমা দেখলেই আমাদের মনে হত এই যে সিনেমায় এতো গাড়ি দেখি কলকাতার রাস্তায়, বিরামহীনভাবে এত গাড়ি কোথায় যায় আর আসেই বা কোথা থেকে। যেখানে মানুষকে দুদিন আগে থেকে একটা বাস ধরে ঠিক সময়ে কোথাও পৌঁছনোর জন্য প্রস্তুতি নিতে হয় সেখানে স্বাভাবিক যে মানুষ এই বিস্ময়ে থাকবে। স্কুলের বই -তে পড়া শহর কলকাতা তখন আমাদের কল্পনা দিয়ে তৈরি। ছোটবেলা থেকেই পড়েছি, পরীক্ষায় উত্তর লিখেছি যে কলকাতায় কী কী দেখার জায়গা আছে। ভিক্টোরিয়া, শহীদ মিনার, চিড়িয়াখান, জাদুঘর ইত্যাদি তখন আমাদের মনের কলকাতা। কলকাতায় যাদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল তাদের আমরা একটু উঁচু নজরেই দেখতাম।

কলকাতার কলেজে পড়তে যাওয়া দাদা-দিদিরা আমাদের কাছে বিশেষ সমীহের ব্যক্তি ছিল। ওদের মুখে বিস্ময়ামুগ্ধ হয়ে আমরা শুনতাম কলকাতা বইমেলার কথা, কত কমদামে কলেজ স্ট্রিট বই পাওয়া যায়, সেসব কথা। সেখান থেকে আমাদের এলাকার বই ব্যবসায়ীদের আমরা ভীষণ বড় লোক মনে করতাম। বই -এর ব্যবসায় লাভের ইয়ত্তা নেই যেন। কলেজস্ট্রিটে যেন প্রায় বিনা পয়সায় বই পাওয়া যায়। কলকাতার কলেজের স্যোশালে বড় বড় শিল্পিরা আসে, কতজন তাদের নিজে চোখে দেখেছে, ছবি তুলেছে, অটোগ্রাফ নিয়েছে, তারা আমাদের কাছে বড় মানুষ। কারণ আমরা তো সেইসব শিল্পিদের কেবল ক্যাসেট শুনেছি বা দেখেছি। কলকাতা বইমেলায় কত সাহিত্যিকদের সঙ্গে সেইসব দাদা-দিদিদের কথা হয়েছে, তাঁদের হাত থেকেই সই করে বই নিয়েছে সেইসব দাদা-দিদিরা।

আমার এক জেঠতুতো ভাই একবার তার কোনও দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে, কলকাতায় গেছিল। সে ফিরে এলে, বিকেলে খেলার মাঠে আমরা সবাই তাকে ঘিরে ধরে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘হ্যাঁ রে, কী দেখলি কলকাতায়’? ও ঐটুকু বয়সেই কি সুন্দর গুছিয়ে মিথ্যে কথা বলেছিল, বলেছিল, ‘মিঠুন-বচ্চন মোটর সাইকেলে ঘুরছে’। আমরা সবাই সবিস্ময়ে ভেবেছিলাম, তাতো হবেই। ওটা তো কলকাতা।

যে কথা বলছিলাম, আমাদের প্রাইমারি স্কুল জীবনে কলকাতা। রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাটা, পড়েছিলাম না সহজপাঠ -এ, “একদিন রাতে আমি স্বপ্ন দেখিনু”। খুব মজা পেয়েছিলাম আমরা। সুর করে করে আমরা পড়তাম। “কলিকাতা চলিতেছে নড়িতে নড়িতে/…কলিকাতা শোনে নাকো চলার খেয়ালে/ নৃত্যের নেশা তার স্তম্ভে দেওয়ালে/… কলিকাতা আছে সেই কলিকাতাতেই।” ইত্যাদি। আমাদের ‘সহজপাঠ’, ‘কিশলয়’ -এ নানা অনুষঙ্গে কলকাতা ফিরে ফিরে এসেছে। স্কুলের দেওয়ালে থাকা পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপে ছোট্ট কলকাতা দেখে মনে হত, কলকাতা এত ছোট!

(চলবে)

শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২, ২০২২

হাফ-মফস্বলীর নগর-দর্শন-২

আমাদের টিভিতে কখনও ডিডি-বাংলা আসত না, আসত ডিডি-১। আর ডিডি-২ আসত অ্যান্টেনা অনেক ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিলে। তাও ঝিলঝিল করত পর্দা। ছোট কাকা নীলগঞ্জ বাসডিপোতে ট্রেনি হিসাবে কাজ করতেন তখন, আইটিআই কল্যাণী থেকে পাশ করে। ছোটকাকা যখন বাড়ি আসতেন তখন শনিবার রাতে চুপিচুপি পড়া ফাঁকি দিয়ে কাকার সঙ্গে দেখতাম সুপার হিট মুকাবিলা। সেজোকাকার টিভিতে। কিন্তু বড়দের আপত্তিতে সেটা দেখা বন্ধ হয়। কারণ সেইসব হিন্দি নাচগান তখন আমাদের কাছে ছিল, ‘লাইলাপ্পা’, অশোভন। খুব মন খারাপ হতো শুনে যে ডিডি বাংলায় সারাদিন বাংলা অনুষ্ঠান হয়। কত সিনেমা হয়। কিন্তু সেসব দেখতে গেলে ডিস অ্যান্টেনা লাগে। অনেক খরচ। কিন্তু চমৎকৃত হয়েছিলাম শুনে যে কলকাতায় ওসব কিছু ছাড়াই ডিডি বাংলা দেখা যায়। এমনকি কলকাতায় অ্যান্টেনাই লাগে না, টিভির সঙ্গে যে ছোট্ট অতিরিক্ত একটা এরিয়েল পাওয়া যেত সেটা গুঁজে দিলেই নাকি কলকাতায় সব দেখা যায়। ছোটবেলায় আমার এক মাসতুতো দাদা যে কৃষ্ণনগরে থাকত, সে বলেছিল কৃষ্ণনগর এতো ডেভেলপ করছে যে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৃষ্ণনগরকে কলকাতা করে দেওয়া হবে।

আমি যখন ক্লাস নাইন-টেনে পড়তাম তখন থেকে একা একাই কৃষ্ণনগর আসার অনুমতি পেয়েছিলাম। মাসির বাড়িতে আসার একটা লোভ ছিল রঙিন টিভিতে ডিডি বাংলা, আলফা-তারা-আকাশ প্রভৃতি চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখা। সেইসব অনুষ্ঠান দেখতাম আর ভাবতাম এইসব চ্যানেল আমার বাড়িতে নেই বলে আমি কত পিছিয়ে যাচ্ছি। কিচ্ছু শিখছি না। কলেজ থেকে ক্যান্টিন টাইপের কিছু অনুষ্ঠান হতো, সেখানেই প্রথম শুনি, একজন গিটার বাজিয়ে গান গাইছে “কফি হাউসের আড্ডাটা আজ আর নেই”। চমকিত শ্রদ্ধা জেগেছিল আমার সেই কলেজ পড়ুয়ার প্রতি। এইভাবে এক কামনা জড়ানো সম্ভ্রম তৈরি হচ্ছিল কলকাতার প্রতি।

মাধ্যমিকের টেস্ট পেপার আর হাইস্কুলের সমস্ত কোশ্চেন ব্যাঙ্ক ছিল মনে মনে কলকাতার মধ্যে নিজেকে দেখার একটা লালসা তৈরির কারণ। প্রায় সমস্ত স্কুলই কলকাতার। মনে মনে অনির্দিষ্ট কলকাতাবাসী ও তামাম কলকাতা শহরের ছেলেমেয়েদের জীবনের প্রতি লোভ-শ্রদ্ধা ইত্যাদি তৈরি হয়েছিল। মনে মনে ভাবতাম কবে কলকাতায় পড়তে যাব আর পুজোর ছুটিতে দল বেঁধে বন্ধুরা ট্রেনে করে ফিরব বাড়ি। টেস্ট পেপার প্রশ্নের উত্তর করতে করতে মনে মনে ভাবতাম ঠিক এইসময় কলকাতার কোনও ছেলেমেয়ে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর করছে বা টেস্টে এইসব প্রশ্নের উত্তর করেছে যা আমাদের হাতে তিন মাস পরে এসে পৌঁছচ্ছে। তাদের মনে মনে কল্পনা করেছি বহুবার, বহুদিন ধরে। আর বিমুগ্ধ হয়েছি তাদের বিদ্যাবুদ্ধি ও স্মার্টনেসের কল্প প্রতিমা মনে মনে এঁকে।

আনন্দমেলা বা প্রতিদিন পত্রিকার বুধবারের ‘পড়াশুনো’ সাপ্লিমেন্টারি ও মাসিক পড়াশুনো পত্রিকা ছিল আমাদের নিজেদের মাধ্যমিকের জন্য তৈরি করার অন্যতম মাধ্যম। অন্যদিকে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই চোখের সামনে ভেসে উঠছিল কত স্কুলের ছবি, নাম, সেরা ছাত্রছাত্রীদের বক্তব্য, ছবিসহ, তাদের সখ ইত্যাদি। হবি শব্দটা বিশেষভাবে তখন জানা। এখানে বলে রাখা ভালো যে কেবল কলকাতা নয়, যেকোনও নগরই আমার কাছে ছিল কলকাতা সম। নিদেন পক্ষে এই মানসিক প্রত্যয় ছিল যে, সব শহর আসলে কলকাতার পাশে। বর্ধমানের মেমারি স্কুলের একটি মেয়ে, মনে আছে, জানিয়েছিল যে তার প্রিয় লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় আর প্রিয় রচনা দুই খন্ডে প্রকাশিত লোটাকম্বল। পরে অবশ্য লোটাকম্বলের অখন্ড সংস্করণ প্রকাশিত হবে। সেই প্রথম আমার মনে হল, আর বোধ হয় ভালো ছাত্র হওয়া হল না। আমার সখ কি আমি জানি না, আমার প্রিয় লেখক নেই, প্রিয় উপন্যাসও নেই! উপন্যাসই তো পড়িনি কিছু সেই অর্থে, দু’একটা যা পড়েছি, তা মনে করে বলতে হবে। তদুপরি মেয়েটির প্রিয় লেখক রবীন্দ্র-নজরুল-শরৎ-সুকান্ত কেউ নয়! সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়? তিনি কে? সেই প্রথম এই লেখকের নাম জানা।

প্রথম যখন কলকাতা ঘুরতে আসি, সেই আসার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কৃষ্ণনগরে ট্রেনে বসেছি মায়ের সঙ্গে, মা -কে জিজ্ঞেস করতেই, হঠাৎ মা বলল চল, কলকাতা যাব। আমি মায়ের হাত ধরে টেনে নামাতে যাচ্ছি, মা কে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলছি, না যাব না, আমি জানতাম না তো, আমার ভয় লাগছে। মা বলল, ধুর পাগল ভয় কি! আমার বান্ধবী চাকরি করে কলকাতা পুলিশে, ওর ঠিকানে দিয়েছে উল্টোডাঙ্গা স্টেশনের খুব কাছে। ওর কুয়ার্টারে থাকব আমরা। আমার সেই মুহুর্তে সব কেমন অচেনা লাগছিল, ভয় লাগছিল, ভাই -কে ফেলে এলাম, বাবাও সঙ্গে নেই। পরে মাসির বাড়ি পৌঁছে বাবার অফিসে ফোন করে জানানো হয়েছিল, শুনে তো বাবা আকাশ থেকে পড়ে। দিদা মাকে বলেছিল কলকাতার ট্রেনে প্রছুর খাবার পাওয়া যায়, প্রচুর জিনিস পাওয়া যায়, বাড়ির কাজে লাগে। সব কিছু খুব সস্তা। দিদা কিছু টাকা দিয়েছিল মা -কে শুধু ট্রেনে খাওয়ার জন্য। ক্রমে ক্রমে ট্রেন যখন আমার চেনা পৃথিবী ছাড়তে থাকে তখন এক অনির্বচনীয় আনন্দ আর স্বপ্ন আমাকে ঘিরে জমাট বাঁধে। দ্রুত কিছু ছবি-কথা, কলকাতা নিয়ে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়, চোখের সামনে দিয়ে আসে আর যায়। আমি কিছুটা ভয় পাই, কিছুটা বিহ্বল হই।

লাইব্রেরি মানে লাইব্রেরি নয়, আমাদের কাছে লাইব্রেরি মানে ছিল বই -এর দোকান। মায়ের বান্ধবী, মানে মাসির বাড়ি এসে ঠিক করেছিলাম, কলেজ স্ট্রিট থেকে কিছু বই কিনব। শুনেছি খুব সস্তায় বই পাওয়া যায়। মেসো -কে বললাম লাইব্রেরি যাব, মেসো জিজ্ঞেস করলেন কার্ড আছে? আমি ভাবলাম যাহ! কলেজ স্ট্রিটে বই কিনতে কার্ড লাগে! এইজন্য বই এতো সস্তা ওখানে, সবাই কিনতে পারে না। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, না বই কিনব কিন্তু কার্ড লাগে তো জানতাম না! মেসো তখন বললেন, ও কলেজ স্ট্রিট যাবে, বই -এর দোকানে? ঠিকাছে। কিন্তু সেবার আর যাওয়া হয়নি কলেজ স্ট্রিট।

সালটা ২০০০। আমার ক্লাস এইটের অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ। নতুন সহস্রাব্দ। তখন প্রথম শুনি ওয়াই টু কে। তা নিয়ে কত জল্পনা! বড়লোকদের ব্যাংকের সব টাকা শূন্য হয়ে যাবে, সারা পৃথিবী জুড়ে বিজ্ঞানীরা কম্পিউটারের কীসব কাজ করছে এই বিরাট বিশ্বজোড়া সভ্যতার ভাঙন রুখতে! শেষ অবধি সেসব রোখা গেছিল। কলকাতায় তখন তৈরি হয়েছে মিলিনিয়াম পার্ক। সেই প্রথম এবং শেষবারের জন্য মিলিনিয়াম পার্ক দেখা। প্রথম কলকাতায় এসে পা রেখেছিলাম বিধাননগর স্টেশনে। এই স্টেশনটা ভারী অদ্ভুত! ওভার ব্রিজ কেবল যেন! স্টেশন কম! সেই ওভার ব্রিজের উপর থেকে দেখেছিলাম হাজার হাজার গাড়ি নীচে যাচ্ছে আর আসছে। ভয়, কেবল ভয় পেয়েছিলাম! এই তবে কলকাতা! এই তবে বাংলা সিনেমায় দেখা ট্যাক্সি! কালো-হলুদ! মাসির বাড়ি দশ তলায়, পুলিশ কুয়ার্টার। এপ্রিলের গরমেরও সেই কদিন ভোর রাতে কাঁথা গাঁয়ে দিতে হতো। এতো হাওয়া! গোটা কলকাতা দেখা যেত। যুব ভারতী ক্রিড়াঙ্গন, সায়েন্স সিটি, ধাপার মাঠ! রাতের আকাশ হলুদ হয়ে থাকত, এতো আলো এতো! দশ তলার ঐ ছোট্ট ব্যালকনি থেকে রাত জেগে কলকাতার আকাশ দেখতাম, গাড়ির শ শ আওয়াজ শুনতাম! অবাক পৃথিবী! বিস্ময়! এই শহরে মানুষ হারিয়ে যায় না! তখন কি জানতাম আমার জীবনের স্থায়ী ঠিকানা হবে এই বিধাননগর, হার্ডকোর সেই দশতলা পুলিশ কুয়ার্টার উল্টো দিকের কোনও জায়গায় থাকবে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স কুয়ার্টার! আমার মতো হাফ-মফস্বলীর এই হল প্রথম নগর দর্শন। অনেকটা কলকাতার আঁচল ছুঁয়ে যাওয়া। অন্ধের হস্তিদর্শনও বলা চলে! 

রবিবার, ফেব্রুয়ারী ৫, ২০২৩

সন্তোষ কোম্পানির ভাঙা রেডিওটা

গোটা করিমপুরের ইতিহাস, বাংলাদেশ থেকে হেঁটে আসা, কুষ্টিয়া-মেহেরপুর-ভেড়ামারার ইতিহাস নিরলসভাবে বলে যেত দাদু। কিচ্ছু মনে নেই আমার। আমি তখন ক্লাস সেভেন, প্রস্তুতিহীনভাবেই দাদু চলে গেল। দাদুকে দু’দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, হঠাৎ পৌষের এক রাতের শেষে বাবা হাসপাতাল থেকে ফিরে জানালো দাদু মারা গেছে। ঘুম থেকে তুলে আমাকে আর ভাই -কে সেই খবর দেয় মা। খবরটা বুঝতেই অনেক সময় লেগেছিল আমার। ক্রমে ক্রমে বুঝেছিলাম দাদুর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের প্রায় সব ইতিহাস হারিয়ে গেছে। মৃত্যুর আগে দাদু একটা বংশপঞ্জী তৈরি করেছিল তার স্মৃতি থেকে। ছোটকাকার কাছে সেই টুকরো কাগজটা রাখা আছে। দাদু ছোটকাকাকেই যোগ্য মনে করেছিল বংশপঞ্জী সংরক্ষণের জন্য।

দাদু-ঠাকুমা-রা চলে গেলে একটি প্রজন্ম কেবল শেষ হয়ে যায় না। শেষ হয়ে যায় একটা ইতিহাস। যে ইতিহাস আর কেউ কোনও দিন বলতে পারবে না। সেই ইতিহাসের মধ্যে আমাদের শৈশবের শিঁকড় থাকে। তুচ্ছ যে আসলে মায়ায় ভরা এই বিস্মৃতির মধ্য দিয়ে আমাদের বড় হয়ে ওঠা। তুচ্ছতার মায়া যত আমাদের চোখ থেকে হারাবে আমরা ততই বড় হবো, বুকের বাঁ দিকে ছোটবেলায় সত্যিই টনটন করত। এখন করলে ভয় লাগে কোলেস্টরল বা ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়েছে বোধ হয়! দাদু-ঠাকুমা-দের স্মৃতির মধ্যে সেই বুকের বাঁদিকের টনটন করা ব্যাথা থাকে। মা সংসারের কাজে আর বাবা সংসারের প্রয়োজনে ব্যস্ত থাকাই বাজ পড়ে ন্যাড়া হয়ে যাওয়া খেলার মাঠের নারকেল গাছের ইতিহাস মানে দাদু। হলুদ গুঁড়োর মতো পুরনো ইঁটের ভেঙে পড়া বাড়িটা কি সুন্দর রঙে আর মানুষে সেজে ওঠে দাদুর গল্পে। দোতলা বাড়িটা রেশনের দোকানের সামনে একা হয়ে অথচ কি ঔদ্ধত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেনা ছাওনির ইতিহাস বুকে নিয়ে- এই ইতিহাস মানে আমার দাদু।

এই পৌষে, তেইশ বছর আগে। তখনও বুঝিনি মৃত্যু স্বাভাবিক। শুধু মনে হতো দাদু শেষবার চলে যাওয়ার সময় কি ভেবেছিল এই যাওয়াটাই শেষ যাওয়া! মৃত মানুষের জন্য এই আমার আক্ষেপ, তারা কি জানে পিছনে যা কিছু ফেলে যাচ্ছে সেসব এই শেষবারের মতো! এটুকু জানা মৃত মানুষের খুব দরকার বলে মনে হতো। এই যে আমার মনে হচ্ছে, এই মনে হওয়াটাই মায়া। মৃত মানুষ মৃত্যুর আগে কেবল নিজের যন্ত্রণার কথাই ভাবে, এমন বলেছিল আমার সব থেকে কাছের একজন মানুষ। দাদুর জন্য আমার এই আফশোষ কাটতেই বেশ সময় লেগেছিল। কিন্তু যৌথ পরিবারে সুখ ও শোক কোনওটাই দীর্ঘ স্থায়ী হয় না। তেরো দিনের অশৌচ। খালি পায়ে হাঁটছিলাম, পাড়ার অনেকেই বলল এই শীতে এভাবে অশৌচ পালনের দরকার নেই। চটি পড়া শুরু হলো। সবাই একসঙ্গে নদীতে স্নানে যাওয়া, প্রবল শীতে একসঙ্গে রোদ পোয়ানো অশৌচ বেলায়। আতপ চালের ভাত, ছোলার কাঁচা ডাল সেদ্ধ, সঙ্গে সৈন্ধব লবণ। দুপুরে একসঙ্গে বসে সব ভাইবোনদের আড্ডা, লুডো খেলা বা তাস, বিকেল-সন্ধ্যায় লুকোচুরি। ক্রমে ক্রমে এক এক করে আত্মীয়স্বজন, বিকেলে পাড়ার বয়স্কদের গল্প ঠাকুমার সঙ্গে। একটু একটু করে সদ্য বিধবা হওয়া ঠাকুমার চোখের জল শুকোয়, ভাঙা গলা ধীরে ধীরে ঠিক হয়। প্রবল শীতের সন্ধ্যা পেরোলেই দীর্ঘ রাত যেন মৃত্যুর মতোই নিঃসঙ্গ, ভয়ের! কাটতেই চায় না।

একসঙ্গে এতজনকে এতদিন ধরে কখনও পাইনি। মৃত্যুর শোক যৌথ পরিবারে বেশিদিন থাকে না। সবাই একটু একটু করে হাসতে শুরু করেছে। শ্রাদ্ধের দিন মৃত্যুর সব স্মৃতি আবার ফিরে আসে। বাবা একবারই কেঁদেছিল, যখন জামাকাপড় ছেড়ে সাদা কাছা পড়তে হয়। শ্রাদ্ধের সকাল থেকে প্রবল ব্যস্ততা। সবই ঠিক চলে, বুকের ভিতরের কষ্টটাও তেমন আর মনে হয় না। ওদিকে গীতা পাঠ। শেষ বেলায়, সূর্য ডোবার আগে স্নানে যাওয়া, অশৌচ ভঙ্গ হবে, ঠিক তার আগে হয় ‘ধম্বলি’। মৃতের জন্য শেষ গান গাইবেন একজন, সে গান যে কি করুণ, কি একক, কি ভরাট, কি মায়া, কি হাহাকার করা, বোধ হওয়ার আগেই ঝরঝর করে নোনা জল চোখ বেয়ে গাল-ঠোঁটের কোনা ছুঁয়ে থুতনি দিয়ে নেমে যায়। সবাই কাঁদে, কান্নার কি বুক বিদীর্ণ করা রোল ওঠে! সেই যেন ভাব-বিমোক্ষণ!

দাদুর মৃতদেহের পাশে বসে হাত-পা ছুঁড়ে ঠাকুমা কেঁদেছিল আর বলেছিল ‘আমার কৃষ্ণ চলে গেল’। যেকোনও মৃত্যুই বোধ হয় কোনও একজনকে সব থেকে বেশি শোক দেয়। সবাই মিলে ঠাকুমা-কেই সামলাচ্ছিল। আলতা, সিঁদুর পরানো, শেষবারের জন্য। এই যে রীতি, এই যে সজ্জা, এই যে সত্য- বড় যন্ত্রণার, বড় যন্ত্রণার! বুকের ভিতর মুষড়ে দেয়, শরীরের সব শক্তি নিংড়ে নেয়, দাঁড়ানোর ক্ষমতা চলে যায়। বৈধব্যের এই সূচনা, শুরুতেই বারবার মনের গভীরে স্বামী হারানোর পর পৃথিবী যে সম্পূর্ণ আলাদা এইই যেন বোঝাতে চায়। সবাই মিলে এই বোঝানোর কাজ শুরু করে। এক সঙ্গে অনেক হারানোর যন্ত্রণা।

আমি ভয়ে দাদুর মৃত মুখ দেখতে পারছিলাম না। আমাকে নিয়ে যাওয়া হল দাদু-কে শেষ প্রণাম করার জন্য। শীতে শক্ত হয়ে যাওয়া পা-দুটোই কোনও রকমে হাত ছুঁয়ে প্রণাম করলাম। ঠাকুমা এক মাথা ভর্তি সিঁদুর নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল। মনে মনে সেই মুহুর্তে আমি অনেক বড় হয়ে গেছিলাম। সেদিন প্রথম অনুভব করলাম আমার ক্লাস সেভেনের বুক কোনও যন্ত্রণা ধারন করতে পারে। আমরা এতজন ভাই-বোন থাকতে আমিই কেন! খুব অপ্রস্তুত লাগছিল, ঠাকুমা-কে কি বলা উচিত বুঝতে পারছিলাম না। সান্ত্বনার ভাষা তখনও আমি শিখিনি। সবাই বলেছিল দাদু নাকি বলত আমি দশজনের একজন হবো, তাই ঠাকুমা আমাকে ধরে কাঁদছে। আমি জানতাম না দশজনের একজন হওয়া মানে কি!

ধীরে ধীরে সবাই চলে যায়। সবার জীবন নিজেদের ছন্দে চলতে থাকে। জীবন তো একসঙ্গে শুরু করেছিল ঠাকুমা আর দাদু। তাই দুপুরগুলোয় বা ভরা সন্ধ্যার নিঃসঙ্গতায় ঠাকুমা হাউহাউ করে কাঁদত, কোনও কোনও দিন। সে কান্না সবার কাছেই খুব তুচ্ছ, কারণ সবাই শোক থেকে বহুদূরে। আমি সেই কান্না-কে ভয় পেতাম। তাই কাছে যেতাম না। সেই কান্না ঠাকুমার একার, সেটুকুই ঠাকুমার সব স্মৃতির সম্বল, বাকি সব, বাকি সবাই বহু দূরে, এক বাড়িতেও নিজেদের জীবনে।

যৌথ পরিবারে হারানোর স্মরণ সামর্থ্যের বাইরে। মনে মনে ভাবতাম ঐ দিনটাই বাড়িতে কীর্তন হবে, লুচি-মিষ্টি হবে, দাদুর ছবিতে মালা দেওয়া হবে। কিন্তু সে খরচ করবে কে! বাবার জেঠুর বাড়িতে, সেই দাদুর মৃত্যুদিন ঐভাবে স্মরণ করা হতো। সেই দেখেই শোকের সাধ জেগেছিল আমারও। কিন্তু সেজো কাকার উদ্যোগে একবার খুব ছোট করে একটা স্মরণ হয়েছিল। আর কোনওদিন হয়নি। দাদুর ছবি আমাদের সবার বাড়িতে আছে। দাদুর একমাত্র মায়াময় স্মৃতি, নিত্যদিনের স্পর্শের সঙ্গী সন্তোষ কোম্পানীর হ্যান্ডেল ভাঙা রেডিওটা ছোটকাকার কাছে রয়ে গেছে। পরম যত্নে রেখেছে কাকা…

মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১৮, ২০২২

দাদুর রেডিও

আকাশবাণী কলকাতা ছিল জ্ঞানের দরজা। দাদু সারাদিনই প্রায় রেডিও শুনতেন। দেশ-বিদেশ সম্বন্ধে বেশ জ্ঞান ছিল তাঁর। রেডিও বন্ধ করলেই সেসব কথা নিজের মতো করেই বলে যেতেন। পাড়ার শিবু দাদু ছিল দাদুর নিত্যদিনের সঙ্গী। সকাল আর সন্ধ্যায় হত তাঁদের আড্ডা। দাদু শুয়ে থাকতেন, চোখে দেখতেন বড্ড ঝাপসা আর শিবু দাদু একটা বেঞ্চে বসে থাকতেন। দেশ-বিদেশের নানা গল্প এক নাগাড়ে বলে যেতেন দাদু। সেসব কোনও কিছুই আমার মনে নেই। সেইসব গল্পের সঙ্গে বারবার যে দাদুর অতীত দিনের গল্প মিশে থাকত, সে কথা কিছুটা মনে আছে। আমি জীবনে ওরকম প্রখর স্মৃতিধর গল্পবলিয়ে দেখিনি। দাদুর কাছে একবার শুনেছিলাম তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলে তা হবে দু’দিনের। একদিন যাবে উত্তর গোলার্ধ, আরেকদিন যাবে দক্ষিণ, আর ভারত বলে কোনও দেশের চিহ্নই নাকি থাকবে না। শুনে খুবই ভয় লেগেছিল আমার। এই বুঝি যুদ্ধ হয় হয়! কদিন পর আবার ভুলেও গেছিলাম। তবে একটা ভরসা ছিল যে রাশিয়া নাকি বলেছে কেউ ভারতের গায়ে হাত দেওয়ার সাহসও যেন না করে। রাশিয়া সম্বন্ধে সপ্রশংস আলোচনা সেই সময় অনেকের মুখেই শুনতাম।

মা-কাকিমারা আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবরে কাজই বা কী! একমাত্র আকর্ষণ সকাল ন’টার গানে-গানে। সংসারের বহু কাজের মাঝে একমাত্র বিনোদন ছিল সেই আকাশবাণী। ন’টা বাজলেই মা-কাকিমা দাদুকে বলত রেডিও চালাতে। স্থানীয় সংবাদের আগে পনের মিনিট হবে গানে-গানে। ঐটুকু বিরাম। ভোরবেলায় গোবর ছড়া দেওয়া, ঝাঁট দেওয়া থেকে তো মায়ের কাজ শুরু হত। ঐটুকু বিরাম, গানে-গানে। প্রতিদিন মুখিয়ে থাকা। বিনোদনের প্রতীক্ষায় মানুষ কী নিরলস পরিশ্রম করে যেতে পারে, মা -কে দেখে বুঝেছিলাম।

আমার দাদু ছাড়া আরেকজন ছিল আমাদের পাড়ায়, যার কাছেও বিচিত্র সব খবর পাওয়া যেত। কারোর কোনও বিষয়ে কিছু তথ্যের দরকার হলে চট করে উত্তর পাওয়া যেত তার কাছে। যেমন ধরা যাক আই-আর-৮ কে পাঠিয়েছে, বাসমতি চাল নিয়ে আমেরিকার গ্যাঁট-চুক্তি, সার্জা কাপ-শাহারা কাপ, মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের খবর, জাতীয় রাজনীতি-রাজ্য রাজনীতি, কোন স্টেডিয়াম কোন রাজ্যে, বিশ্বসুন্দরী কে হল, কান চলচ্চিত্র উৎসবে কে যাচ্ছে, রাশিয়া ভারতকে কীভাবে সাহায্য করছে, সব। সে হল আমাদের সত্যেন দা। ঘোষবাড়ির সত্যেন দা। একটা ছোট্ট আয়তকার এন্টেনা-ওয়ালা রেডিও ছিল তার। কী পরম যত্নে সেই রেডিও রাখত সত্যেন দা। প্রতিদিন আমাদের বাড়ির পাশে পান বরজে কাজ করার সময় রেডিও শুনত। বিকেলে কাজ শেষ করে, খাল থেকে স্নান করে, ভাত খেয়ে আমাদের বাড়ির সামনে দুই রাস্তার বাঁকে এক চিলতে ঘাসের জমির উপর বসে আড্ডা হত। আর তখন চলত বিবিধ ভারতী। হিসাব করে চালাতেও হতো, এভারেডি ব্যাটারি।

আমার সেজো কাকা, গ্রামীণ পোস্ট অফিসের পিওন। বহু সাধ করে কিনেছিল একটা রেডিও। একদম নিজের সম্পদ সেটা। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় এক হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল আর অন্য হাতে সেই খয়েরি রঙের পেন্সিল ব্যাটারির এন্টেনা-ওয়ালা রেডিও শুনতে শুনতে ফিরত। সেই ছিল কাকার বিলাসিতা। মহালয়ার দিন ভোর চারটেই রেডিওতে মহালয়া হবে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের নাম পরে দেখেছি ক্যুইজ কম্পিটশনে জিজ্ঞেস করা হত। আমরা জানতাম মহালয়া। নিজে থেকে না উঠলে দাদুকে ডেকে তোলা হত না। সারাদিন বিছানায় থাকার ফলে দাদুর ঘুমের সময়ের ঠিক ছিল না। আলো জ্বেলে, বারান্দায় মাদুর পেতে সেজো কাকা বসে পড়ত। ডেকে তুলত আমাকে আর ভাই -কে। ঘুম ঘুম চোখে উঠে ধীরে ধীরে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে এবাড়ি ওবাড়ি থেকে জ্ঞাতি-ভাই, পাড়ার বাকিরা হুল্লোড় শুরু করতাম। পাড়ায় খনা কাকা সাধ করে একটা মুদিখানার দোকান দিয়েছিলেন। তাঁর সব থেকে বড় আবিষ্কার ছিল আমড়া ব্যোম নিয়ে আসা আমাদের পাড়ায়, সস্তায় ভালো আওয়াজ। মহালয়ার দিন আমরা আমড়া ব্যোম ফাটাতাম।

সন্ধ্যাবেলায় পড়তে বসা। দাদু -কে বাধ্য হয়েই রেডিও বন্ধ রাখতে হতো বা আওয়াজ খুব কমিয়ে দিতে হতো। বিরাট উঠনের এক পাশে আমাদের ঘর অন্য পাশে সারি দেওয়া পরপর ঘরে দাদু-ঠাকুমা-ন কাকা-ছোটকাকা- ছোট পিসি। বারান্দায় বসে একদিকে আড্ডা চলত বড়দের, অন্যদিকে আমার আর ভাই -এর পড়ার সে কি আয়োজন! ঠিক সময় সাঁওতালি ভাষার গান হতো, নেপালি ভাষার গান, তর্জা-কবিগান। নেপাল একটা আলাদা দেশ, নেপালি গান কেন হতো জানি না, ভাবিনি। কিন্তু চমকে যেতাম সাঁওতালি গান হলেই। আমাদের গ্রামের প্রান্তে খালের পাড়ে বিশাল পাঁকুড় গাছের নীচেই তো সাঁওতাল পাড়া! সাঁওতালদের কালো-পেটানো চেহারা, সাপ-ব্যাং-বেজি সব খায়, ওরাও এখন হিন্দু, কিরকম মিষ্টি মিষ্টি বাংলা বলে! বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করতে গিয়ে জানবো এই তো ‘অপর’। অজ্ঞানের ঔদ্ধত্য কীভাবে ‘অপর’ নির্মাণ করে। আমাদের বাংলা অনার্সে কবিগান-তর্জার ইতিহাস পড়া হবে জেনে প্রবল আনন্দ হয়েছিল, কিন্তু মন ভরেনি। দাদুর দৌলতে সেসব ছিল শৈশবের স্মৃতিকাতরতা, বই -এর পড়ায় কি মন ভরে!

একবার দুর্গা পুজোয় আমাদের পাড়ায় নবমীর রাতে ড্যান্স কম্পিটিশন হবে। হিন্দি গান, নাচ। প্রথম তিনিজন পাবে একটা করে গেঞ্জি (টি-শার্ট বলে জানতাম না)। পাড়ার সখের ড্যান্সারদের মধ্যে একটি সাঁওতাল ছেলেও ছিল। সে নাচ শেষ করতেই, একজন মুসলিম যুবক, ওর নাম ভুলে গেছি এখন, বলে উঠল, সাঁওতাল ছেলেটিকেই ফার্স্ট করতে হবে। আমাদের গ্রামের মধ্যে দিয়েই চলে গেছে একটি খাল। খড়ে নদী আর ভৈরব নদের যোগ হল সেই খাল। সাঁওতাল পাড়া খালের ঐ পাড়ে, আর মুসলিম পাড়া খালের এই পাড়ে, হিন্দু পাড়ার শেষে। বিচারক ছিলেন সিপিআইএম পার্টির আমাদের এলাকার নেতা, দাসু কাকা। সবাই খুবই মান্য করত কাকাকে, অনেক গুণ ছিল কাকার। ২০০৯ সালের ৯ জুলাই কলকাতা থেকে ফেরার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর অকাল মৃত্যু ঘটে। রাজনীতি করা কাকার উপস্থিত বুদ্ধি ছিল বেশ, বললেন তোরা আগে থেকেই ভাবছিস কেন ও ফার্স্ট হবে না! রেজাল্ট বেরোল, কাকা ঘোষণা করল, আমি বিচারক, আমি মানুষ, আমার মত আর সবার মত এক নাও হতে পারে, সবাই ভালো ড্যান্স করেছে, কিন্তু প্রথম হয়েছে, সেই সাঁওতাল ছেলেটি। আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম, কীভাবে একা সব ভিড় উত্তেজনা সামলেছিল কাকা, হাসি মুখে। রেজাল্ট বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে জমায়িত সাঁওতাল আর মুসলমান যুবকদের সেকি আনন্দ, কি জয়ের উল্লাস! আমার ছোটকাকার বন্ধু, শ্রীবাস কাকা, খাল পাড়ে মুসলিম পাড়া আর সাঁওতাল পাড়ার নিকটেই যাঁর মুদিখানার দোকান, সঙ্গে সঙ্গে কুড়ি টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করলেন সেই ছেলেটির জন্য। আরও আনন্দ। পাড়ার বড়রা খুব খুশি হয়েছিল, সবাই বলেছিল, “দাসু, তুমি ওদের ঘরে আজ আনন্দ পৌঁছে দিলে”। সদ্য কলেজে পড়া, যে মান্টি দা সেকেন্ড হল, যার ফার্স্ট হওয়ার কথা ছিল সবাই বলছিল, সেই দাদা বলল, “আমি ফার্স্ট হলে কি হতো? কিছুই না। ওদের তো আনন্দই নেই, ও ফার্স্ট হয়ে কতজন আনন্দ পেলো”। আমি প্রথমে দাসু কাকার ঐ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারিনি। পরের দিন দশমী। মান্টি দা’র মুখে এই কথা শুনে মনে হল, ও বড়রা এইরকম ভাবে! আমি যেদিন এইরকম ভাবতে পারব সেদিন আমি বড় হব। গ্রামের প্রান্তে থাকা এই দুই সম্প্রদায়, মুসলিম-সাঁওতাল কি সেদিন প্রান্ত থেকে লড়াই করেছিল? কেন্দ্রের উপরে জয় হয়েছিল প্রান্তের? আজ মনে হয়। বহু পরে কলকাতায় এসে শুনেছিলাম, “আমি চাই সাঁওতাল তাঁর ভাষায় বলবে রাষ্ট্রপুঞ্জে”!

নব্বইয়ের দশক তো যৌথ পরিবারগুলো ক্রমে ক্রমে ভেঙে যাওয়ার দশক। আমাদেরও একদিন ভাঙল। একদিন আমাদের বাড়িতে ফিলিপ্স কোম্পানির রেডিও এলো। কালো রঙয়ের। সন্তোষ নাকি তখন বেশ পুরনো। ফিলিপ্স আরও উন্নত। যৌথ পরিবার ভেঙে গেলে, আমাদের হাঁড়ি আলাদা হলে মায়ের কাজ অনেক কমে গিয়েছিল। ফলত দুপুরের পর ছিল মায়ের অখন্ড অবসর। হাই স্কুল থেকে ফিরতে বিকেল হতো। দেখতাম মা আরাম করে ঘরে বসে মুড়ি খাচ্ছে, আর শুনছে বিবিধ-ভারতী। সেই শোনা দিব্যা ভারতী, জিনা তামনদের নাম, রোজা-মেরা জীবন কোরা কাগজ-মিস্টার ইন্ডিয়া-শোলে, অমর-আকবর-আন্টনি প্রভৃতি সিনেমার কথা। এই হল বোম্বে! আর আমরা শুনছি বিবিধ ভারতী। সবাই ওখানে সিনেমা করে! সবাই ওখানে নায়ক-নায়িকা! তখন ভাবতাম।

আমার মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে, আমার একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম ছিল ছোটবেলার সেই ফিলিপ্সের রেডিও। রাত দশটা থেকে সাড়ে দশটা অবধি শুনতাম বহরমপুর এফ-এম। কলকাতা এফ-এম কোনওদিনই আমাদের তরঙ্গে ধরা দিত না। ঐ আধঘন্টায় চলত বহরমপুর এফ-এম। প্রতিদিন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই গান প্রায়। শুনতাম, তালাত মেহেমুদ, “রূপের ঐ প্রদীপ জ্বেলে কী হবে তোমার/ কাছে কেউ না এলে এবার”, কিংবা মানবেন্দ্র, “বনে নয়, মনে মোর পাখি আজ গান গায়”, অথবা হেমন্ত, “কুটিলেরও মন্ত্রে, শোষণেরও যন্ত্রে, গেল প্রাণ, শত প্রাণ গেল রে”, সঙ্গে নিয়মিত লতা-আশা-সন্ধ্যা-আরতী, আর হৈমন্তী শুক্লার, “এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না, যাতে মুক্ত আছে”!

যে কথা বলছিলাম, দাদুর রেডিও প্রসঙ্গে বলতে বলতে, ধান ভানতে শিবের গীত! ফিরে আসি। প্রতি রবিবার দুপুর তিনটেই অনুষ্ঠিত হতো “গল্প দাদুর আসর”। ঐ সময়টুকুর জন্য দাদুর রেডিওটা ছিল আমার। “শুনছেন গল্পদাদুর আসর, পরিচালনায় মুকুল বন্দ্যোপাধ্যায়”। যে শিশুরা অংশ নিত তাদেরকে দূরতম দ্বীপ বলেই মনে হতো। যে শিশুদের গলা শোনা যেত তারা যে আমাদের মত নয়, ঐ বয়সেই বিলক্ষণ বুঝেছিলাম। আমাদের গ্রামের প্রথম অধ্যাপক মালতী পিসি, দ্বিতীয় অধ্যাপক মনোজ কাকা। মনোজ কাকা তখন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রেডিও -তে চিঠিপত্রের একটা আসর হতো। সেরা দুটো চিঠি ও সেই চিঠির লেখককে ডাকা হতো আকাশবাণী ভবনে। রেকর্ডিং হতো সঞ্চালক ও পত্রপ্রেরকের আলাপচারিতা। সঞ্চালক কি সুন্দর করে পড়তেন সেই চিঠি। মনোজ কাকা লিখতেন ‘সমাজ সেখ’, ছদ্মনামে। সেই চিঠি ও আলাপচারিতায় উঠে এসেছিল সম্প্রীতির কত কথা! দুর্গাপুজোর ঠিক আগে আগে সেই চিঠি রেডিওতে পড়া হয়েছিল। আমরা দুর্গা মন্ডপে জড়ো হয়ে প্রতিমা তৈরি দেখতাম, বুঝিনি, কিন্তু মন দিয়ে শুনেছিলাম সেই চিঠি। আর সামনে বসেছিল মনোজ কাকা। কি অ-বাক বিস্ময় তা। মনোজ কাকা শুনেছিলাম তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাম-ছাত্রআন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী।

দোয়াত-কলম চিহ্ন নিয়ে পঞ্চায়েত ভোটে নির্দল প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন আমাদের স্কুলে সদ্য চাকরি পাওয়া শিক্ষক শ্রী পার্থসারথী মুখার্জী। তাঁর নামের নীচে পোস্টারে লেখা ছিল “শিল্পি, শিক্ষক, সমাজসেবী”, পরের লাইনে ছিল বেতার প্রসিদ্ধ শিল্পি। অপূর্ব গীটার বাজাতেন স্যার। প্রায়ই আহূত হতেন সুদূর কলকাতার আকাশবাণী ভবনে। রেডিওতে শুনেছিলাম তাঁর গিটার, সামনে থেকে তখনও শুনিনি, “মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি”!

শনিবারে হাফ-স্কুল। দুপুর একটায় বাড়ি চলে আসতাম। সকালে ভাত খেয়ে স্কুলে যাওয়া, ফিরে এসে আবার ভাত খাওয়া। শুরু হতো অনুরোধের আসর। সেই সুরে সুরে আশেপাশের বাড়ির কাকিমা-দিদিরাও সুর মেলাত। রাস্তায় বেরোলেই এক বাড়ির আনুরোধের আসর মিহি হয়ে আসতেই শোনা যেত আরেক বাড়ির আনুরোধের আসর। এক এক করে জানছি তখন এই পশ্চিমবঙ্গের আনাচা-কানাচে লুকিয়ে থাকা কত কত জায়গার নাম। সেই তখন শুনেছিলাম, “পরবর্তী গানের জন্য অনুরোধ করেছেন, দাঁতন, মেদিনীপুর থেকে, রুম্পা-ঝুম্পা-টুনু-বুলু-ছোট মাসি-কার্তিক দা-নমিতা বৌদি ও ঠাকুমা…”।

(চলবে)

সোমবার, মে ১৭, ২০২১


প্রদীপের বন্ধুরা

“প্রদীপের বন্ধুরা”, ছোটবেলায় প্রাইমারি স্কুলে পড়া একটা গদ্য। ঐ হলো ভারত চেনা। ভারতের নানা রাজ্য থেকে এসেছিল প্রদীপের বন্ধুরা। তারা তাদের অঞ্চলের বিশেষ কিছু শিল্প নিদর্শন এনেছিল প্রদীপকে উপহার দিতে, তার জন্মদিনে। প্রদীপ প্রত্যেককে দিয়েছিল বাঁকুড়ার পুতুল ঘোড়া। বড্ড মন খারাপ হয়েছিল, এমন বন্ধু যদি আমারও থাকত তাহলে কি সুন্দর একটা পুতুল ঘোড়া উপহার পেতাম। পুতুল ঘোড়ার কথা সেই প্রথম জানা। দিল্লীর বন্ধুর নাস্তা করা যে আসলে ‘ব্রেকফাস্ট’, সে শব্দ জানতাম না, প্রাতঃরাশ সম্বন্ধেও ধারণা স্পষ্ট নয়, সকালে ছিল আমাদের কেবল, ‘কিছু খাওয়া’। আমাদের পাড়ার এক কাকা, চিত্রশিল্পী (আমাদের ভাষায় ছবি আঁকতেন), তাঁদের বাড়ির দেওয়ালে কালো খড়ি দিয়ে আঁকা ছিল ভগত সিং এর মুখ। সেই প্রথম একজন সুন্দর অচেনা পুরুষের মুখ দেখে খুব মজা পেয়েছিলাম, ‘আরে! আমাদের কিশলয়তেও তো এমন একজনের মুখ আছে’। বই -এর পড়া, খেলার মাঠের পাশে বাড়ির দেওয়ালে! সে যে কি অনাবিল আনন্দ কি বলব! সেই কাকা থাকতেন দিল্লীতে। তাঁরা একবার করে বেড়াতে আসতেন গ্রামের বাড়িতে। সেই কাকার ছেলেমেয়েরা এলেই পাড়ায় তখন শুনতাম, ওরা নাস্তা করবে। এরকম একটা শব্দ, কেমন খেতে কি জানি! না জেনেই লোভ হত। পরে জানলাম নাস্তা মানে চাপাটি, আরও অনুসন্ধান করে জানলাম, ধুস্‌ ওসব এমন আহা মরি কিছু নয়, চাপাটি মানে রুটি। আরও অনেক পরে জেনেছিলাম নাস্তা আসলে সকালে ‘কিছু খাওয়া’। কিন্তু ঐ ‘নাস্তা’ শব্দ দিয়ে দিল্লী কিছুটা বাড়ির কাছে এলো, যদিও এই প্রত্যয় সেই শৈশবেই ছিল যে ‘দিল্লী বহুদূর’, নইলে নেতাজী আলাদা করে কেনই বা বলবেন, ‘দিল্লী চলো’!

আমাদের নয়ের দশকের বড় হওয়ার মধ্যে ছিল সাক্ষরতা অভিযান, ব্ল্যাক বোর্ড, চক আর প্রাপ্ত বয়ষ্কদের শিক্ষার কিছু বই। ছোটকাকা পঞ্চায়েত থেকে আমার জন্য একটা ভাঙা ব্ল্যাকবোর্ড জোগাড় করেছিল, সঙ্গে কিছু চক। সাতের দশকের সিলেবাসের পুরনো কিছু বই, নানা ক্লাসের, আমাদের সার দেওয়া লম্বা মাটির বাড়ির একদম প্রান্ত ঘর, যার নাম ছিল খোপের ঘর, সেই ঘরের তোরঙ্গতে তোলা ছিল, পরিত্যক্ত যত্নে। একটা সরু, মালপত্র ভর্তি প্রান্ত ঘর বলেই সেটার নাম ছিল হয়তো খোপের ঘর। বড় হয়ে গল্প উপন্যাসে অবশ্য এরকম ঘরের নাম পড়েছি ‘ভাঁড়ার ঘর’।

স্কুল থেকে ফিরে আমি বারান্দায় বসে ভারতের ম্যাপ আঁকতাম। হাইস্কুলে উঠলে কাজে লাগবে নাকি। এখন থেকে হাত পাকিয়ে নিচ্ছি তাই। ছোট কাকা প্রশিক্ষিত ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি হওয়ায় আঁকার হাত ছিল ভালো। কাকার আবছা চকে একে দেওয়া ভারতের ম্যাপের উপর আমি প্রথম প্রথম হাত বুলাতাম। ক্রমে ক্রমে ঐ একটা ছবিই আমি আঁকতে শিখেছিলাম, সেটা হল ভারতের ম্যাপ। তিনদিক ভারত ঘেরা বাংলাদেশকে কখনও বিছিন্ন করতে মন চাইত না। নীচের সুন্দরবনটাও তাহলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। ভারতকেও কেমন কোল শূন্য মনে হত। তাই আমার ম্যাপে চিরকাল বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গেই আঁকা হয়েছিল। কেমন জানি একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কার প্রতি। ভারতের নীচে ঐ একটা দ্বীপ, তারপর তো অসীম সাগর। হয়তো শ্রীলঙ্কার নিঃসঙ্গতা তখন মনে মনে অস্ফুটে টের পেয়েছিলাম, তাই ভারতের ম্যাপে শ্রীলঙ্কাকেও বাদ দিতাম না। তখন আবশ্য জানতাম না যে এই শ্রীলঙ্কাই ঠাকুমার কাছে শোনা রামায়ণের গল্পের লঙ্কা, এবং তা নিয়ে তখনও অবশ্য নাসা’র লঙ্কা কান্ড শুরু হয়নি। ছোটবেলায় জানতাম একসময় যুক্ত থাকা শ্রীলঙ্কা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে কোনও এক প্রাকৃতিক-ভৌগলিক কারণে। পরে বড় হয়ে জানলাম ঠাকুমার কাছে শোনা হনুমানদের পাথর জোড়া দেওয়া সেতু নাসা আবিষ্কার করেছে নাকি!

শ্রীলঙ্কা। ১৯৯৬। সনৎ জয়সূর্য, অর্জুন রনতুঙ্গা, অরবিন্দ ডিসিলভা, চামিন্ডা ভাস, আতাপাত্তু, মুরলিথরন। আমাদের পাড়া ক্রিকেটে তখন আলোচনার বিষয় জয়সূর্যর লড়াই, তাঁর বাবা জেলে, নদীতে মাছ ধরতেন তিনি আর একটা বল বা হাতের কাছে যা পেতেন তাই নিয়ে জয়সূর্য বল করা প্রাকটিস করতেন। আমার ভাই তখন গাছ থেকে পড়ে যাওয়া ছোট ছোট নারকেলের টুকরো নিয়ে বল করত, আপন খেয়ালে। পাড়া ক্রিকেটের দাদাদের মধ্যে কি আলোচনার ঝড় উঠত তখন জয়সূর্যদের নিয়ে। আমাদেরও ছিল বেশ মজা, চামিন্ডা ভাস তখন অবোধ হাস্য-মজায় চামুন্ডা, আতা(ফল বিশেষ)পাত্তু। ক্রিকেট বিশ্বকাপের সেমি ফাইনালে প্রথম ওভারে শ্রীনাথ দুটো উইকেট নিয়ে নিলেও ঐ দলের ছ’নম্বর ব্যাটসম্যানও যে ম্যাচ জেতাতে পারে, আমরা হিসাব করিনি। দ্বিতীয় ওভার শুরু হতেই চকোলেট ব্যোম কিনে আনে পাড়ার দাদা-কাকারা। ম্যাচ শুরু আগে অবশ্য একটা করে দিয়ে আমাদের ভিডিও গেম খেলতে দেওয়া হয়েছিল, ক্লাব ঘরে ভাড়া করে আনা রঙিন টিভি -তে। দশ ওভার যেতেই সবাই বুঝে গিয়েছিল গতিক ভালো না। ম্যাচ হারার পর, শোনা গেল, ইডেনে যিনি পিচটা তৈরি করেছিলেন, তাঁর নাকি জীবনের শেষ পিচ তৈরি ছিল ওটা। উনি নাকি বলেইছিলেন যে আগে ব্যাট করবে সেইই ম্যাচ জিতবে। আজাহার সব জেনেও টসে জিতেও ব্যাটিং কিনা নিল পরে। নিশ্চয় টাকা খেয়েছে। অতয়েব রাতেই কুশপুত্তলিকা দাহ করা হল আজাহারের। এক স্বতঃস্ফুর্ত জনরোষে। আরও রাগ হয়তো ছিল, এতগুলো টাকা অনির্দিষ্ট প্রত্যাশার নিশ্চয়তায় খরচ হয়ে গিয়েছিল বলে। দু’দিন পরে আরও সব গোপন তথ্য আমরা পেতে থাকলাম। শ্রীলঙ্কার ব্যাটে নাকি চম্বুক লাগানো ছিল, ফলত বল তুমি যেদিকেই করো ব্যাটে ছুটে এসে লেগে ছুটে বেরিয়ে বাউন্ডারি, নিদেনপক্ষে চার। গতবছর লক ডাউন শুরু হতে আমি বিশেষভাবে কন্সপিরেসি থিওরির কথা শুনি। সে যাকগে। স্কুলের ভূগোল ক্লাস। ক্লাস নেবেন বিশ্বনাথ অধিকারী। এলাকায় তাঁর প্রবল জনপ্রিয়তা। মার্ক্সবাদী ও সমাজসেবী হিসাবে সম্মানও ছিল বিশেষ। তিনি বলেছিলেন সিলেবাসের ভেতরের পড়াশুনোয় তিনি আমাদের আবদ্ধ রাখতে চান না। শুরু হল বিশ্বকাপ। প্রবল উৎসাহ ও এক্সক্লুসিভ খবরের উদ্দীপনায় আমরা বলতে থাকলাম, যে জা শুনেছি। সব শুনে উনি যা বলেছিলেন, তাতে এমন মন খারাপ হল, সেমিফাইনাল নিয়ে আর আলোচনা করিনি। উনি বলেছিলেন, শ্রীলঙ্কা, একটা ছোট্ট দেশ, একটা গরীব দেশ, সে এইরকম একটা ক্রিকেট দল তৈরি করে এই প্রতাপে ম্যাচ জিতে আমাদের আত্মবিশ্বাস ধ্বসিয়ে দিয়েছে, আমরা মেনে নিতে পারছি না, এই স্পর্ধা। তাই এইসব আজগুবি গল্প। আহা রে! শ্রীলঙ্কা! ও গরীব! মানে জয়সূর্যও গরীব!

১৯৯৬ এর ক্রিকেট বিশ্বকাপ আমাদের কাছে বেশ উত্তেজনার ছিল। বিশ্ব যে কলকাতাও, যদিও তখনও কলকাতায় যায়নি, কলকাতায় আমাদের কোনও আত্মীয়ও নেই, তবুও, রাজধানী তো। এখন ঠিক মনে নেই, কিন্তু সেই সময় কারোর কারোর মুখে ‘উপমহাদেশ’ কথাটা শুনেছিলাম। ম্যাচ হবে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার নানা স্টেডিয়ামে। সেই প্রথম শোনা ইডেনের পাশাপাশি, গ্রিনপার্ক, মোহালি, লালবাহাদুর শাস্ত্রী, চিন্নাস্বামী, নেহরু, সরদার প্যাটেল, মোতিবাগ, ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়ামের নাম। বারবার শোনা তখন করাচি, লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি কিংবা কলোম্ব স্টেডিয়াম।

কিছু বছর আগেই নিহত হয়েছেন দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রি শ্রী রাজীব গান্ধি। আমাদের পাড়ায় তখন তিনটে বাড়িতে টিভি। দাদুর সঙ্গে মেজো কাকার বাড়ি গেছিলাম রাজীব গান্ধির সৎকার অনুষ্ঠান দেখব বলে। সেই থেকে কফিন দেখলেই ভয় লাগত। কিছুই জানি না, কিছু ছবি দেখা ছাড়া। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রির জন্য মন খারাপ করত। কোনও মৃত্যু তো ইতোপূর্বে এভাবে খবর হতে, প্রতিদিন আলোচনার বিষয় হতে দেখিনি। ক’দিন পর পাশের বাড়ির জেঠুর কাছে সাপ্তাহিক বর্তমানের একটা সংখ্যা আসে। সেখানে রাজীব হত্যার ছবি ও গ্রাফিক দেওয়া ছিল। মানব-বোমা শব্দটাও সেই প্রথম শোনা। সেই ভদ্রমহিলার ছবি দেখে অনেক দিন ভেবেছি, একজন মানুষ কীভাবে নিজে মরে যাবে জেনেও আরেকজনকে মারতে এসেছিল! তদুপরি শৈশবের পুরুষ-মন। শৈশবে যেভাবে পুরুষ ও পৌরুষের বোধ প্রগাঢ় থাকে, সেইভাবে প্রগাঢ় বোধ হয় আর হয় না। বারবার মনে হচ্ছিল একজন নারীর হাতে পুরুষের এভাবে মৃত্যু! এই লিঙ্গ-চেতনা অনেক সময়ই অসুরের পক্ষ নিয়েছে, ছোটবেলায় মহালয়া দেখতে গিয়ে। পরক্ষণেই মনে হত, না, অসুররা তো শয়তান, কি ভয়ংকর দেখতে ওরা। ওদের মেরেছে ভালোই করেছে। তবে সব থেকে মন খারাপ হত শুম্ভ-নিশুম্ভের হত্যায়। বোধ হয় আমরাও দুই ভাই বলে। শুম্ভ-নিশুম্ভ দুই ভাই -এর হত্যা হলে, মনে হত, এবার ওদের মা-বাবার কি হবে!

রাজীব-হত্যার পর শুনি, এল টি টি ই জঙ্গির কথা। তারা নাকি তামিল। কিন্তু তামিল হয়ে এদেশের মানুষকেই মারল কেন! আর ভাবিনি। তামিলনাড়ু, করুণানিধি ইত্যাদি নামগুলো বারবার কানে আসত। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নাম প্রায় প্রতিদিনই শুনি তখন। বলছি গোটা নব্বই -এর কথা। বয়স পাঁচ থেকে পনের হবে, নব্বই -এর শুরু আর শেষে। একাধিক নির্বাচন। সেই শোনা আমাদের প্রধানমন্ত্রির নাম হারাদানাহাল্লি ডোড্ডেগৌড়া দেবগৌড়া। খুব হেসেছিলাম। এ আবার কি নাম। পাড়ার শিবু দাদু বলেছিলেন, ওরা ‘সাউথ ইন্ডিয়ান’, ওদের নামের সঙ্গে গ্রামের নাম, বাবার নাম সব থাকে। ভেবেছিলাম এ আবার কেমন মজা। এখন বুঝি, যখন বহু ভেবেও ভোটার আইডিটা গ্রামের কেন্দ্রেই নোঙর করা আছে। প্রতিবার নির্বাচনের আগে অনেক বাস নিয়ে নেয় নির্বাচন কমিশন, প্রখর গরমে ও প্রবল ভিড়ে বাড়ি পৌঁছনো বেশ কষ্টসাধ্য। তারপরেও। দেবগৌড়াদের মতো নয়, ক্ষীণভাবে জুড়ে থাকার চেষ্টা গ্রামের সঙ্গে ভোটার কার্ড দিয়ে।

১৯৯৮ সালের জানুয়ারি মাসে একটা বীভৎস দুর্ঘটনায় পদ্মানদীর গর্ভে তলিয়ে যায় পিকনিক ফেরত স্কুলের ছাত্রছাত্রী ভর্তি বাস। মর্মান্তিক সে ঘটনা আমাদের মফস্বলের ইতিহাসে। এই ঘটনার মর্মবেদনা প্রথমে তেমন বুঝিনি। বুঝলাম যখন প্রধানমন্ত্রী শ্রী ইন্দ্রকুমার গুজরাল এই ঘটনার প্রেক্ষিতে শোক জ্ঞাপন করলেন। বিস্মিত হয়েছিলাম, কীভাবে জানলেন প্রধানমন্ত্রী দিল্লীতে বসে, কাকেই বা জানালেন ওঁর শোকের কথা? ওঁর শোকের কথা আলাদা করে কীভাবে জানা যায়! বিস্ময় ও মুগ্ধতা জেগেছিল। বুঝেছিলাম আমার গ্রাম-মফস্বল-জেলা, এই চেনা বৃত্তের বাইরে কি অদৃশ্য সূত্রে আমরা বাঁধা আছি। প্রতিদিন একটু একটু করে কানে আসত ভারতের কথা, নানা প্রদেশের কথা, নানা ভাষার কথা, আর রাজনীতি। রাজনীতির কথা। বাড়িতে খবরের কাগজ আসত না কোনওদিনই। কিন্তু মনে মনে একটা দেশ বপন ও বয়ন হচ্ছিল। কীভাবে? যখন শেষ বয়সে প্রায় অন্ধ হয়ে যাওয়া আমার দাদুর সন্তোষ কোম্পানির সবুজ-খয়েরি রঙের রেডিওতে বাজত, “আকাশবাণী কলকাতা। খবর পড়ছি বরুণ মজুমদার। আজকের বিশেষ বিশেষ খবর হল…”।

(চলবে)

রবিবার, মে ০২, ২০২১

নেট পরীক্ষা সম্বন্ধে দু'চারটি কথা যা আমারও বলার আছে

 (১)

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করতে গেলে নেট বা সেট পরীক্ষায় পাস করতে হয় এইটুকু তথ্য স্কুলে পড়তেই জেনেছিলাম। আমার ছোট কাকা চাকরির খোঁজের জন্য যখন সপ্তাহে একদিন করে কর্মক্ষেত্র নিত, তখন আমিও সেই কর্মক্ষেত্রের পাতা উল্টেপাল্টে দেখতাম। স্কুলে পড়তে পড়তেই দেখার সুযোগ হয় ‘আনন্দমেলা’, ‘পড়াশুনো’ ইত্যাদি পত্র-পত্রিকা। সেই সময় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় আর উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, -এই তিনটে প্রতিষ্ঠান ছিল নেট পরীক্ষার সেন্টার। ফলত কলকাতা শহরে যারা থাকতো তারা নেট পরীক্ষার জন্য কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজস্ট্রিট ক্যাম্পাসের দ্বারভাঙ্গা বিল্ডিংয়ের চার তলায় এসে ফর্ম জমা দিত। সেই একবার বা কেবলমাত্র এই কারণেই বহু লোক কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজস্ট্রিট ক্যাম্পাসে ঢুকতো। আর তাদের মুখে শুনেছি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে নানা অপ্রীতিকর বক্তব্য। ঘিঞ্জি, অফিস চেনা যায় না, লোকজনের ব্যবহার ভালো না, রাস্তাটা কেমন, সিঁড়িটা অন্ধকার, আলোটা ঝলমলে নয় ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। যাদের কাছ থেকে এই কথাগুলো শুনতাম তাদের একটি বড় অংশের ছাত্রছাত্রীরা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, যারা নিয়মিত কলেজস্ট্রিটে এলেও এই একটি কারণেই এই ক্যাম্পাসটিতে ঢুকতো। এইসব কথা শুনে আমার বেশ মজাই লাগতো, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গলিঘুচি সবই আমার চেনা ছিল তখন। 

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির চারতলা অনেককে ব্যবহার করতে হতো টেম্পোরারি কার্ড নিয়ে। কারণ সেই সময় নেটের প্রশ্ন কেবলমাত্র সেন্টারের লাইব্রেরীতেই রাখা থাকতো। আমি যখন নেট পরীক্ষা দিচ্ছি ২০০৮-২০০৯ সালে, তখনও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারতলার লাইব্রেরী রুমে বসে বসে পরীক্ষার প্রশ্নগুলো টুকে আনতাম। অসংখ্য প্রশ্ন হাতে বসে টুকতে হতো। সেই সময় না ছিল স্মার্ট ফোন না ছিল সেই প্রশ্নপত্র জেরক্স করার সুবিধা। অবলম্বন কেবলমাত্র হাতে লেখা। এর জন্য যেমন সময় খুঁজে বের করতে হতো তেমনই ধৈর্যেরও বহু দরকার ছিল। কিন্তু প্রশ্ন টুকতে টুকতে, বছরের পর বছর প্রশ্ন টুকতে টুকতে প্রশ্নগুলো খুব চেনা হয়ে যেত। একটা ধারণা তৈরি হয়ে যেত পরীক্ষায় কেমন প্রশ্ন আসতে পারে। অথবা আমি যে ডিসিপ্লিনে পরীক্ষা দিতে বসেছি, বসতে চলেছি, সেই ডিসিপ্লিনটার ধারণা ঠিক কেমন। কিন্তু আমার গল্প ঠিক এটা নিয়ে নয়, আমার গল্প হচ্ছে আমি কোন সাবজেক্টে নেট পরীক্ষা দিলাম আর সেই নেট পরীক্ষা দেওয়ার জন্য আমি সাবজেক্ট কীভাবে পছন্দ করলাম, তা নিয়ে। কিছুদিন পরে সম্ভবত ২০০৯ সালের ডিসেম্বরের নেট বা ২০১০ সালের জুন মাসের নেট পরীক্ষার আগে বিগত কয়েক বছরের প্রশ্নপত্র ইউজিসি তাদের ওয়েবসাইটে দিয়ে দেয়। কিছু পুরনো প্রশ্ন অল্প কিছু দিন ওয়েবসাইটে রেখেই তুলে নেয়, আর কিছু প্রশ্নপত্র দীর্ঘদিনের জন্য রেখে দেয়। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে আমি কম্পিউটার, ইন্টারনেটসহ ব্যবহার করতে শিখি তখন একটি ইমেল আইডি খুলি যার নাম পথচলা। একইসঙ্গে সাইবার ক্যাফে তে গিয়ে অরকুট খুলি, তারিখটা যতদূর মনে হয় ৮ ই ফেব্রুয়ারি ২০০৯। পরে প্রশ্নপত্র পাওয়া গেলে ইউজিসি সাইট থেকে পরম আনন্দে আমি সব সংগ্রহ করে নিই, এবং সবগুলোর প্রিন্ট করিয়ে নিই। তখন আমি হায়দ্রাবাদে এমফিল করছি। প্রতিমাসে প্রায় ৫০০ টাকা পেতাম কন্টিঞ্জেন্সি হিসাবে, যেখান থেকে খাতা, পেন, প্রিন্ট আউট ইত্যাদির খরচ চালানো যেত। 

নেট পরীক্ষার দিকে এগোনো ও কোন বিষয়ে নেট দেবো এই বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ছিল আমার জন্য খুব বড় একটি জার্নি। এই সিদ্ধান্ত আমার ভবিষ্যতের পথকে অনেকটাই ঠিক করে দিয়েছিল। ব্যক্তিগত পরিসরে আড্ডায় আমি অনেককেই সেইসব কথা বলেছি অনেকবার। নিজেরই কেমন রোমাঞ্চ লাগে, ভাবলে এখন। আমি বাংলা অনার্সের ছাত্র আর এম এ পড়েছি তুলনামূলক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে। ফলত আমাকে কেউ বাংলাও ভাবত না, তুলনামূলক সাহিত্যও ভাবত না। “ভারতীয়” এই কথাটা ট্রেন বা ক্রিকেট টিমের জন্য ঠিক আছে, সাহিত্যের জন্য খুব একটা পরিচিত ছিল না। ফলত ভারতীয় সাহিত্যের ছাত্র বললেও লোকজন ঠিক ধারণা তৈরি করতে পারত না। আর এত বড় একটা বিভাগের নাম নিয়ে, যারা শুনত তারা হাসাহাসি করত। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি একটি কোর্স করার জন্য যেতাম, সেখানে অনেক তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে, তারা আমাকে নানাভাবে বোঝায় যে আমি যেটা পড়ছি সেটা তুলনামূলক সাহিত্য নয়। একটা পরিচয় তৈরির জন্য তুলনামূলক সাহিত্যের ইতিহাসের আশ্রয়ে আমার নিজেকে অবস্থান করানোর দরকার ছিল। অন্যদিকে যেহেতু আমাদের বিভাগ নিয়ে একেবারেই লোকজন কেউ জানত না, এমন কি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরের লোকজনও তেমন জানত না। তাই দীর্ঘদিন ধরে যারা তুলনামূলক সাহিত্য চর্চা করছে তারা একাধিক শব্দবন্ধের সঙ্গে তুলনামূলক সাহিত্য জুড়ে আছে দেখলে নানা কৌতূহল, সন্দেহ, কখন অবজ্ঞা বা অশ্রদ্ধা নিয়েই বিষয়টিকে দেখবে। আরও একটি প্রশ্ন আমাকে সামনা করতে হতো তাহলো, কারা পড়ান। যারা পড়ান তারা কি তুলনামূলক সাহিত্য জানেন, না জানলে যা পড়ান তা তুলনামূলক সাহিত্য কি! সেইসময় নিজেকে অসহায় মনে হতো, আর এখন এ সবই স্বাভাবিক বিদ্যায়তনিক অনুসন্ধান বলে মনে হয়। বরঞ্চ এইসব দ্বিধা – সন্দেহ অবজ্ঞা ইত্যাদি আমাদের আরও ভালো করে ডিসিপ্লিনের পাঠপদ্ধতির অভিমুখে নিয়ে যেতে পারে। পরে ক্রমে ক্রমে যখন জনমানসে আমাদের বিভাগের নাম একটু একটু করে পৌঁছেছে, যোগাযোগ বেড়েছে তখন যাদবপুরের অধ্যাপক ও অনেক বন্ধুদের সহযোগিতা, ভালোবাসা, ও সম্মান পেয়েছি। এবং আমাদের আলোচনার সুযোগ ঘটেছে ডিসিপ্লিন নিয়ে। সেসব কথা অন্য অধ্যায়ে গভীরে আলোচনা করব। 

ইতিমধ্যে আমি তুলনামূলক সাহিত্যের গৌরবের জায়গাটা জেনে গেছি, তুলনামূলক সাহিত্য কত বড় বড় মানুষ চর্চা করেছেন সে কথাও কিছুটা জেনেছি অথচ যখন আমার চেনা মানুষের কাছে শুনেছিলাম আমি যা করছি তা তুলনামূলক সাহিত্য নয় তখন আমার মনে একটা কষ্ট তৈরি হয়েছিল। কারণ তুলনামূলক সাহিত্যের ঐ গৌরবের জায়গা থেকে, ইতিহাস থেকে আমি বিচ্যুত হচ্ছি। এমনই তুলনামূলক সাহিত্য বিষয়টি নিয়েই জনমানসে নানা খোরাক লক্ষ্য করেছি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে অন্যান্য বিভাগের পড়ুয়াদের যাদবপুরেরই তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে নানা মজা করতে দেখেছি। এবারে এটাও ঠিক যে এরকম মজা খোরাক বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে প্রায় সব কিছু নিয়েই হয়ে থাকে। কিন্তু মুশকিল অন্য জায়গায়। বলছি।

আমি কিছুতেই নিজেকে থিতু করতে পারছিলাম না, বুঝতে পারছিলাম না আমি কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে। আমার ডিসিপ্লিন বলে আদৌ কিছু আছে! এইরকম একটা ‘ইনডিসিপ্লিন্ড’ অবস্থা আমার মাথায় জাঁকিয়ে বসতে থাকে। আমার প্রশ্ন অনেক কিন্তু একটিরও উত্তর আমি জানি না। আমি উত্তর জানি না এটা বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে কার কাছে উত্তর পাবো এ কথাও আমি জানি না। আমি তখন ভাবলাম নিজেকেই নিজের পথ অনুসন্ধান করতে হবে। কারণ আমার আগে তুলনামূলক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে কেউ কখনো নেট পরীক্ষা দেয়নি। এই বিভাগ যাঁরা তৈরি করেছিলেন তাঁদের কাছেও স্পষ্ট উত্তর ছিল না এই বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা কোন বিষয়ে নেট দিতে পারে। 

দীর্ঘদিন ধরে বাংলা এবং ইংরেজি সাহিত্যচর্চার মধ্যে যে সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা গেছে সেই সীমাবদ্ধতা থেকেও যাতে উত্তরণ ঘটে, সেই আদর্শ বিশেষভাবে পরিচালিত করেছিল এই বিভাগ তৈরির পিছনে। এই বিভাগ তৈরির পর, তখনও যদিও পূর্ণ বিভাগ নয়, একটি পাঠক্রম, বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধীনে, একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ করা হয়, তা হলো স্কুল সার্ভিস পরীক্ষায় যাতে ছাত্রছাত্রীরা সুযোগ পায় সেই কথা মাথায় রেখে স্কুল সার্ভিস কমিশনের শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় বাংলা এম এ ডিগ্রির সমতুল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয় এই বিভাগের ডিগ্রিকে। এই কাজটি ২০০৬ সালেই হয়ে যায়। এই প্রয়াস নিয়ে নানাবিধ বিরোধিতা তৈরি হয়। যদিও ২০০৯-২০১০ সালেই আমার বন্ধু স্বরূপ আগুয়ান, এই বিভাগ থেকে পড়ে সরকার পোষিত একটি স্কুলে চাকরি পেয়ে যায়। বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরপরই জানতে পারি যে আমরা স্কুল সার্ভিস পরীক্ষায় বাংলা বিষয়ে বসতে পারি। কিন্তু আমাদের বিভাগে ইংরেজি থেকে দু-একজন, কখনো কখনো সংস্কৃত বা হিন্দি থেকে ছাত্রছাত্রী আসতো। তারা প্রায় বিভ্রান্ত হয়ে যেত এইভেবে যে এমএ পরীক্ষার পর তারা কি করবে। কারণ সমতুল ঘোষণা করা হয়েছে কেবল বাংলার ক্ষেত্রে। তবে একথাও ঠিক যে, এই বিভাগের প্রথম দশ বছরে আশি শতাংশের বেশি ছাত্রছাত্রী আসত বাংলা অনার্স থেকে। বাকি ইংরেজি থেকে, অন্যান্য বিষয় থেকে খুবই অনিয়মিত। ক্রমে ক্রমে অনেকে দেখা গেল বিএড করার সুযোগ পাচ্ছে, আবার কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কোনো কলেজ আমার পরের ব্যাচের তাপস কয়ালের বিএড এর ফর্ম ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। কি সব উল্টোপাল্টা বিভাগ থেকে আমরা পড়ে আসি এই অভিযোগে। তারপরেও ছবি পাল্টেছে, আমার ছাত্রী সোহিনী ভট্টাচার্য কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, এমএড করে এডুকেশনে নেট পরীক্ষায় পাশ করে এখন অধ্যাপনা করছে। 

যে মানুষের কাছে তার নিজের পরিচয় এবং তার অস্তিত্ব খুব একটা সুনিশ্চিত নয়, সেই মানুষ যে কোনো কথাতেই লাঞ্ছিত বোধ করতে পারে। আমি এই বিভাগে পড়তে এসে, পরে বুঝতে পেরেছি প্রান্তিকের অবস্থান আসলে কেমন হয়! পরিচয়ের সংকট একটা অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে এবং তা থেকে জন্ম নেয় অকারণ ভীতি। সবাইকে দেখলেই মনে হয় সে যেন আমাকে সন্দেহ করছে, সে যেন আমাকে ছোট করার জন্য বসে আছে। ফলত আমার এমএ জীবনে যাদের কাছ থেকে আমি লাঞ্ছিত হয়েছি বলে মনে করেছি তারা যে সবাই আমাকে লাঞ্ছিত করতে চেয়েছে এমনটা নয়। কারণ মেজরিটি মাইনরিটির মনের আবেগ কখনো বুঝতে পারে না আর বুঝতে পারে না বলেই মেজরিটি অজান্তেই মাইনরিটিকে কষ্ট দিয়ে ফেলে। একবার আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সিগারেট খাচ্ছি এবং সেই সময় একজন অধ্যাপককে দেখে সিগারেট লুকোই, তিনি তখন একটু হেসে বলেন “আরে সিগারেট লুকোনোর কিছু নেই, আমার সামনে খেতে পারো”, এই পর্যন্ত অত্যন্ত আনন্দের, কিন্তু তারপরেই তিনি যোগ করলেন, “আমরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নই”, এই ঠেসটুকুই মেজরিটির সচেতন বা অসচেতন ঔদ্ধত্য। এই কথা উনি নিছক মজা করেই বলেছেন হয়তো, কিন্তু আমার খারাপ লেগেছিল। 

কলকাতায় এসে মানুষের হাসি দেখলেই আমি ভয় পেতাম, কেউ মেজাজ দেখালে আমার প্রতিক্রিয়া কী হবে তা স্থির করা সহজ ছিল। ঐ অধ্যাপকের ঐ কথায় আমার মনে কিছুটা প্রভাব পড়েছিল। ২৪০ নম্বর বাসে ফিরতে ফিরতে ভেবেছিলাম, আমি নিজে কতটা কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়! কারণ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কোনো বিষয় নিয়ে আমি পড়াশোনা করছি না, যে বিষয়ের ইতিহাস আছে, ঐতিহ্য আছে, দাপট আছে, ক্ষমতা আছে। ফলত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আমাকে কেউ খুব বেশি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে দেয়নি এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে আমাকে অনেক বেশি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় করে দেওয়া হয়েছে। এই যে দ্বৈত, এই দ্বৈত আমার মধ্যে অদ্ভুত একটা বিদ্যায়নিক ভীতি তৈরি করেছিল। আমি এখানে যা বলতে চাইছি তা হলো যে, সামাজিক, ধর্মীয়, ভাষিক, সাংস্কৃতিক – এই সমস্ত প্রান্তিকতার সঙ্গে সঙ্গে পাঠবিভাগের প্রান্তিকতাও মানুষকে প্রবল ভাবে নাড়া দেয়। তাকে বিধ্বস্ত করে, তাকে বিপন্ন করতে পারে। বিশেষত যখন এটা ঘটে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে এবং কোনো একজন ছাত্র এককভাবে লড়াই করে যায় উচ্চশিক্ষায় তার একটা স্থান করে নেওয়ার জন্য। 

এই পরিস্থিতিতে আমি উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না যে আমরা আদৌ নেট দিতে পারি কিনা! কারণ স্কুল সার্ভিস কমিশন আমাদের বিষয়টাকে বাংলার ইকুইভ্যালেন্ট বলে ঘোষণা করেছে কিন্তু কলেজ সার্ভিস কমিশন তো কিছু বলেনি। আমি সেইসময়ের কলেজ সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করলাম তিনি আমাকে নানাভাবে অপদস্ত করলেন, অসম্মান করলেন, এই বিষয় নিয়ে কেন পড়ছি, এইসব ফালতু বিষয়ের কি দরকার, ইত্যাদি ইত্যাদি! আমি তখন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনিও আমাকে কোনো সদুত্তর দিতে পারলেন না। এবং ২০০৭ সালে, একজন এমটেক, নেট পাস করে বা না করে এমফিল সমতুল যোগ্যতায় কলেজ সার্ভিস কমিশনে বসতে পারে কি পারে না এই নিয়ে একটা জটিলতা তৈরি হয়েছিল কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বনাম কলেজ সার্ভিস কমিশনের মধ্যে। তদানীন্তন উপাচার্যের কাছে শুনেছিলাম তাতে নাকি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে একটু ত্রুটি ছিল, যে কারণে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেউ আসছে শুনলে সেই সময়ের চেয়ারম্যান নাকি একটু ক্ষিপ্ত হতেন। সেই কোপে পড়বি পড়, পড়লাম গিয়ে আমি। একেই মরে আছি, তারপর ঢুকেছি খাঁড়র ঘরে। 

২০০৭ সালের শেষ ও ২০০৮ সালের শুরু, আমার কাছে তখন কম্পিউটার ইন্টারনেট কোনো কিছুই নেই, আমার কোনো ইমেইল একাউন্ট নেই, আমি শুধু জানতাম গুগল খুলে কিছু লিখলে সেখানে উত্তর পাওয়া যায়। আমার হোস্টেলের সামনে একটা সাইবার ক্যাফে ছিল। সেখানে গিয়ে সাইবার ক্যাফের মালিকের সঙ্গে আলাপ করে তার সাহায্য চাইলাম ইউজিসি নেটের রেগুলেশন আমাকে যেন তিনি বের করে দেন। সেখানে আমি দেখতে পেলাম যে এমএ যে সাবজেক্টে করা হয়েছে সেই সাবজেক্টে নেট দেওয়া যাবে। যদি এমন কোনো সাবজেক্ট হয় যাতে নেট পরীক্ষা হয় না সেই সাবজেক্টের স্টুডেন্টদের নেট পরীক্ষায় পাশ না করলেও চলবে। আমি তখন দেখলাম, এ আমার কাছে পরম আনন্দের বিষয় যে আমাকে নেট পাস করতে হবে না, কারণ তুলনামূলক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য বলে কোনো বিষয়ই আমি নেটের তালিকায় পেলাম না। যদিও নেটের তালিকায় বাংলা রয়েছে, তুলনামূলক সাহিত্য রয়েছে। কিন্তু তখন তো আমি অজ্ঞান, অশিক্ষিত ছিলাম, ফলত যে বন্ধুরা আমাকে বলেছিল আমার তুলনামূলক সাহিত্য নয়, এটা ভারতীয় সাহিত্য, সেই বন্ধুদের কথায় বিশ্বাস করে আমি স্থির করলাম যে তুলনামূলক সাহিত্যে আমি নেট দিতে পারি না ।

কিন্তু আমি সাইবার ক্যাফে তে ইউজিসির নিয়মে দেখলাম যে অ্যালায়েড সাবজেক্টে নেট দেওয়া যায়, আমি তখন ভাবলাম যে তুলনামূলক সাহিত্য তো আমার অ্যালায়েড সাবজেক্ট তাহলে আমি তুলনামূলক সাহিত্যে নেট দিতে পারি। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর আমাকে কে দেবে আমি জানি না। আর তুলনামূলক সাহিত্যে নেট দেওয়ার জন্য আমাকে হিন্দি বা ইংরেজি ভাষায় লিখতে হবে, আমি বাংলা পড়ে এসেছি ফলত ইংরেজিতে থার্ড পেপারের অত বড় বড় উত্তর লিখবো কি করে? ৫ নম্বরের ২০টা, ১২ নম্বরের ৫টা আর ৪০ নম্বরের একটা। আর লিখতে পারলেও ওই ইংরেজি দিয়ে আমি কোনোভাবে পাশ করতে পারব না। তাহলে আমি বাংলায় নেট দিতে পারি, কিন্তু বাংলায় অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম গ্রাহ্য হবে কিনা জানি না, অন্যদিকে আমি ভারতীয় সাহিত্য চর্চা শুরু করেছি ফলত বাংলায় নেট দেওয়ার জন্য যে গভীরভাবে বাংলা সাহিত্য পড়া প্রয়োজন তা থেকে অনেকটাই দূরে সরে এসেছে। বাংলায় নেট দিতে আমার একটা ভয় আছে। তুলনামূলক সাহিত্যের নেটের যে সিলেবাস সেই সিলেবাস দেখে কিছুই বুঝতে পারলাম না, কারণ ওখানে কোনো গল্প-উপন্যাস-কবিতা-প্রবন্ধের উল্লেখ নেই, যা রয়েছে তা কয়েকটি টপিক মাত্র এবং দেড় পাতায় নেটের সিলেবাস শেষ। আমি তখন আমার লিঙ্গুইস্টিক্সের এক সিনিয়রের সাহায্য নিলাম, তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এই যে কম্পারেটিভ -এর নেটে যে বিষয়গুলো উল্লেখ আছে সেই বিষয়গুলোর মানে কী! সে আমাকে কিছু কিছু ইংরেজি শব্দের অর্থ বুঝিয়ে বলল যে কি কি এরিয়া কভার করা হচ্ছে, কিন্তু সে যেহেতু কখনো তুলনামূলক সাহিত্য পড়েনি ফলত আমাকে বিশেষ কিছু সাহায্য করতে পারল না। আমি তখন তুলনামূলক সাহিত্যের নেট দেওয়ার ভাবনা ছেড়ে টিউশনির টাকায় বাংলার নেটের সমস্ত বইপত্র কিনলাম। ইতিমধ্যে সেটের বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে সেটের ফর্ম ফিলাপ করলাম। কিন্তু আমি সেট পরীক্ষায় বসলাম না, এই নেট/সেটের বই কিনে সেট পরীক্ষায় না বসার মাঝখানে আমার জীবনে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলো। 

আমি নেটের সাবজেক্ট খুঁজতে খুঁজতে একটা সাবজেক্ট পেলাম, ইন্ডিয়ান কালচার। আমি ভাবছিলাম আমার তো ইন্ডিয়ান লিটারেচার তাহলে ইন্ডিয়ান কালচারে আমি নেট দিতে পারি। এবং ইন্ডিয়ান কালচারের সিলেবাসে দেখলাম আসলে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাস এবং তার সঙ্গে কিছু কিছু সাহিত্য রয়েছে। তখন আমি পড়লাম বিপদে, এই ইতিহাস তো আমার গভীরভাবে পড়া নেই। ইতিমধ্যে আমার নজরে এলো সেই বিষয়টি, যেটা দেখেই আমি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠলাম। সেই বিষয়টি হচ্ছে ট্রাইবাল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার এবং নেট পরীক্ষার থার্ড পেপারে ৪০ নম্বরের যে প্রবন্ধ লিখতে হতো সেই প্রবন্ধটি কেবলমাত্র আদিবাসী ভাষায় লিখতে হবে। বাকি ১৬০ নম্বরের উত্তর বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া, ইংরেজি বা কোনো একটি আদিবাসী ভাষায় করা যাবে। আমি তখন বিবেচনা করলাম যে যদি ৪০ নম্বরের আদিবাসী ভাষায় উত্তর না করতে পারি এবং ১৬০ নম্বরের উত্তর খুব ভালো লিখি তাহলে আমি ৯০ নম্বর পাব কিনা! কারণ আমাদের সময় নিয়ম ছিল ফার্স্ট পেপার এবং সেকেন্ড পেপারে কুয়ালিফাই করলে তবেই থার্ড পেপার দেখা হবে আর একজন নেট বা জেআরএফ পাবে কিনা সেটা ঠিক হবে থার্ড পেপারের নম্বরের উপর ভিত্তি করে। লেকচারশিপের জন্য ৯০ পেতে হবে এবং জেআরএফ এর জন্য ১০০। আমার তখন মনে হল, যদি সব প্রশ্ন আমি কমন পাই, সব প্রশ্নের উত্তরও যদি আমি খুব ভালো লিখে আসতে পারি, তবুও ৯০ পাওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার হবে। কিন্তু আমি দেখলাম কঠিন হলেও এই লড়াইটা আমাকে লড়তে হবে তার কারণ এছাড়া আমার কাছে এখন আর কোনো পথ নেই। কিন্তু এটাও কি পথ?

(চলবে)

শুক্রবার, এপ্রিল ২৮,২০২৩

নেট পরীক্ষা সম্বন্ধে দু'চারটি কথা যা আমারও বলার আছে

(২)

ট্রাইবাল অ্যান্ড রিজিওনাল ল্যাঙ্গুয়েজ/লিটারেচার। সিলেবাস দেখে খুব আনন্দ হয়েছিল। কত কিছু বিষয় রয়েছে সেখানে। বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া, অসমীয়া, এই তিনটি ভাষা থেকেও কিছু কিছু প্রশ্ন আসত। আসলে এই সিলেবাসের মধ্য দিয়ে পূর্ব-ভারতের ভারতীয় সাহিত্য তুলে ধরা হয়েছিল। পূর্ব ভারতের সরকারী ভাষা-সমূহ ও আদিবাসী ভাষা-সমূহ একটি সিলেবাসের মধ্যে এনে পূর্বভারতকে বোঝার চেষ্টা। পরে যখন সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে আরও পড়লাম তখন বুঝলাম পূর্ব-ভারতের এই ভাষা সাহিত্যগুলো পরস্পরের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে আছে। তাই এই সিলেবাস আমার খুব পছন্দের। কিন্তু নাহ্‌, এখনও সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি, কারণ কোনো একটি আদিবাসী ভাষায় ৪০ নম্বরের একটি প্রবন্ধ লিখতে হবে যে! ইতিমধ্যে ভারতীয় ভাষা পরিষদে সাহিত্য অকাদেমির একটি অনুষ্ঠানে গেলাম, সেখানে আলাপ হলো যদুমণি বেশরার সঙ্গে। যদুমণী বেশরা সাঁওতালি ভাষায় গীতাঞ্জলি অনুবাদ করেছেন, সাহিত্য অকাদেমি পুরষ্কার পেয়েছেন। উড়িষ্যার মানুষ, চাকরি করেন খড়গপুর রেল ডিভিশনে। তাঁকে এই নেট পরীক্ষার কথা জানালাম, জানতে চাইলাম যে কি ধরণের বইপত্র পড়তে হবে। নেটের এই বিষয়ের তালিকায় যে ভাষাগুলোর উল্লেখ ছিল সেগুলোর মধ্যে ছিল সাঁওতালি, হো, পঞ্চপরগনিয়া, কুরুখ, নাগপুরি ইত্যাদি। যদুমণি বেশরা আমাকে রাঁচির একটি সংস্থার কথা জানালেন, তাঁদের ফোন নম্বরও দিলেন, পরামর্শ দিলেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলে বইপত্র সংগ্রহ করতে। আমি তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম এবং জানতে পারলাম তাঁদের সমস্ত বইপত্র বিশেষ বিশেষ আদিবাসী ভাষা বা হিন্দি ভাষায় লেখা। কোনো আদিবাসী ভাষাই আমি জানি না। আর দু’একটি বই যা আমি হিন্দিতে পাবো তার উপর ভিত্তি করে কিভাবে নেট লেখার ঝুঁকি নেব? আমি বেশ হতাশ বোধ করলাম। এবারে আমার কাছে আর অন্য পথ বেঁচে রইল না। আমাকে তুলনামূলক সাহিত্য বেছে নিতেই হলো নেট পরীক্ষার বিষয় হিসাবে। ফলত তুলনামূলক সাহিত্যে নেট পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনন্যোপায় হয়েই। 

এবার শুরু হল তুলনামূলক সাহিত্যের কোড ব্রেক করার প্রয়াস। দশটা ইউনিট রয়েছে সিলেবাসে। যার কিছুই আমি বুঝতে পারছি না, কেবলমাত্র একটি ইউনিট ছিল কম্পারেটিভ ইন্ডিয়ান লিটারেচার। আরেকটি ইউনিট ছিল সাহিত্যতত্ত্ব যেখানে প্রতীচ্যের সাহিত্যতত্ত্ব ও ভারতীয় সাহিত্যতত্ত্ব বিষয়ে পড়তে হতো। ভারতীয় সাহিত্যতত্ত্বের মধ্যে ছিল সংস্কৃত ও তামিল। সংস্কৃত সাহিত্য তত্ত্ব সেই সময় পড়েছি অধ্যাপক বিমল মুখোপাধ্যায়ের কাছে। তামিল সাহিত্য তত্ত্ব নিয়ে কিছুই জানি না, আর প্রতীচ্যের সাহিত্যের তত্ত্ব বাংলা অনার্সে ছিল না, আমাদের এম এ সিলেবাসে খুব সামান্য ছিল। তা দিয়ে নেট লেখা যাবে না, প্রশ্ন দেখেই বুঝেছিলাম। তখন অমৃতলোক পত্রিকার একটি সংখ্যা, জানতে পারলাম প্রতীচ্যের সাহিত্যতত্ত্ব নিয়ে করা হয়েছে। মেদিনীপুরের বিধাননগর থেকে প্রকাশিত হতো পত্রিকাটি। আমার এক বন্ধুকে দিয়ে অমৃতলোক পত্রিকা প্রকাশনী থেকে বই আকারে প্রকাশিত সবুজ মলাটের প্রতীচ্যের সাহিত্যতত্ত্ব কিনিয়ে আনালাম। সেইটা পড়ে কিছুটা ধারণা করা গেলো। বাকি ইউনিটগুলো নিয়ে কিছুই মাথায় ঢুকছে না। আর আমাদের এমএ সিলেবাসে পড়ানো হয় কেবল বাংলা ও অন্যান্য ভারতীয় সাহিত্যের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের তুলনা। 

সাহিত্য অকাদেমির যে অনুষ্ঠানে গেছিলাম সেখানে আসলে অনুবাদকদের সমাবেশ ঘটেছিল। প্রত্যেকে নিজেদের অনুবাদ নিয়ে কথা বলছিলেন। তাঁরা তাঁদের বক্তৃতা লিখে এনেছিলেন একটি করে কাগজে। আমি প্রত্যেকের কাছে থেকে একটি করে কপি চেয়ে নিই। আমার মনে একটি অলৌকিক সুখানুভূতি তৈরি হয়েছিল। এতজন সাহিত্যিক, অনুবাদকের অনুবাদ সম্বন্ধে চিন্তাভাবনা এখন আমার কাছে। আমি ভাবলাম এই পড়লেই নেটের ট্রান্সলেশন স্টাডিজ ইউনিটের প্রস্তুতি হয়ে যাবে। নেটের সিলেবাসে একটি ইউনিট ছিল ক্রস-কালচারাল স্টাডিজ। একদিন ভবানী দত্ত লেনের সাহা বুক স্টোরে ঘুরতে ঘুরতে গেলাম। সেখানে কালচারাল স্টাডিজ বলে একটি বই পেলাম। সেই বইটা কিনে নিলাম। মন দিয়ে পড়া শুরু করলাম। পরে বুঝেছি এইসব বই বা এই বক্তৃতা সমূহের সঙ্গে নেটের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন “ট্রান্সলেশন অ্যাজ আ স্কিল”, বলে কোর্সটি করছি, তখন একদিন ক্লাস নিতে এলেন শ্রীজাতা গুহ। তিনি পেঙ্গুইন থেকে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কয়েকটি লেখা ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশ করেছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি তুলনামূলক সাহিত্য পড়েছেন এবং নিউ ইয়র্ক থেকে পিএইচডি করেছেন। তাঁর ক্লাস খুব ভালো লাগল। ক্লাসের পরেই তাঁকে বললাম যে আমি তুলনামূলক সাহিত্যে নেট দিতে চাই কিন্তু কি করব কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। তিনি আমাকে চেনেন না, জানেন না, কিন্তু তাঁর ব্যবহার ছিল খুব আপন করে নেওয়া, তাই তাঁকে আমি বলতে পেরেছিলাম। তিনি আমাকে বললেন তাঁর বাড়িতে একদিন যেতে, তিনি সাধ্য মতো সাহায্য করবেন। একদিন ফোন করে সকালে পৌঁছে গেলাম তাঁর বাড়িতে। তিনি সকালের জলখাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। বিরাট বড় কমপ্লেক্স, সিকিউরিটি ফোন করে ফ্ল্যাটের মালিকের অনুমতি নিয়ে ঢুকতে দেয়। অতবড় কমপ্লেক্স দেখে আমি তো থ’! হোস্টেলে থাকলে, আর কিছু থাকুক বা না থাকুক,  পেটে সব সময় খিদে থাকে। জলখাবার তিনি সুন্দর প্লেটে সাজিয়ে দিলেন, আমি বিহ্বল হয়ে গেলাম। তারপর তিনি তাঁর ল্যাপটপ নিয়ে বসে আমাকে বললেন খাতা পেন নিয়ে লেখো। তিনি একটু একটু করে আমাকে ইউনিট ধরে ধরে বুঝিয়ে দিলেন, এবং বললেন কি কি বই পড়া দরকার। একটু দিশা পেলাম। আমি চিরকাল তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।

ইতিমধ্যে আমি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তামিল ভাষা শিখতে ভর্তি হয়েছি, আমি একাই ছাত্র। আর শিখছি মলায়লম, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানেও আমিই একজন ছাত্র। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক তামিল স্টাডিজ বিভাগের পি ভানুমতী, যিনি তামিলে দেবেশ রায়ের “তিস্তাপারের বৃত্তান্ত”, অনুবাদ করে সাহিত্য অকাদেমি পুরষ্কার পেয়েছিলেন। আর আমার মলায়লমের শিক্ষক ছিলেন উর্মিলা অজয়। দুজনই  কি যত্ন করে আমাকে পড়াতেন। ভানুমতী ম্যামকে আমি যখন অনুবাদ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি তখন আমাকে তাঁর লেখা কয়েকটি প্রবন্ধ দিলেন, টাইপ মেশিনে টাইপ করা কপি। এইসব থেকে আমার নেটের জন্য বিশেষ কিছু লাভ হয়নি। কিন্তু যা হলো তা সাংঘাতিক, আমার বেশ একটু একটু জ্ঞান হতে থাকল অনুবাদ নিয়ে। এই জ্ঞান এমনই জ্ঞান যা ঠিক বই পড়ে আসে না। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনুবাদের তত্ত্ব ও তার বিচিত্র জগত সম্বন্ধে তখনও জ্ঞান তৈরি না হলেও অনুবাদ যে একটা ব্যাপার এটা বুঝতে শুরু করেছিলাম।  এর ফল কিভাবে আমি পেলাম সে কথা আরেকটি অধ্যায়ে বলব। 

ইতিমধ্যে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ রবিবারে নেট পরীক্ষা এলো। সিট পড়ল আমাদেরই কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসের তিনতলায়। আমি পরীক্ষা দিতে গেলাম। যাদবপুরের যারা পরীক্ষা দিতে এসেছিল, তারা খুব অবাক হয়ে আমাকে দেখছিল, কারণ আমিই একমাত্র অচেনা মানুষ যে তুলনামূলক সাহিত্যে নেট দিচ্ছি। একজন আমাকে জিজ্ঞেস করল, “হঠাৎ এহেন দুর্মতি?”, আমি বললাম, অনন্যোপায় হয়ে। ছেলেটি বেশ রসিক, তাঁর নাম ধরে পরীক্ষা হলের পর্যবেক্ষক একবার ডেকেছিলেন কোনো একটি কারণে, সে তখন খুব মিহি সুরে উত্তর দিয়েছিল, “এই, আমি এখানে”। সেই সুর ও শব্দ এখনও কানে বাজে। মজা পেয়েছিলাম। 

নেট পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে আমার কলেজের এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো। সে তখন যাদবপুরে ইংরেজি পড়ছে। সে জিজ্ঞেস করল কেমন হল, আমি বললাম ভাই, এই প্রথম ইংরেজি লিখলাম, এরকম সাহিত্যের উত্তর তো ইংরেজিতে লিখিনি কোনো দিন, এসব নেট-ফেট আমার জন্য না। ও বলল, আরে ধুর পাশ করে যাবি! ও খুবই বুদ্ধিমান ও উইটি ছেলে। আমি বললাম না না, এত লোক ইংরেজি জানে, আমি কি করে পারব, ও ওর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলল, আরে তোর কি মনে হয় এখানে সবাই ইংরেজি জানে, জানলে সবাই বিদেশে চলে যেত। বলে সে বেরিয়ে গেল! আমি দাঁড়িয়ে ভাবলাম, ঠিক কি বলল!

 নেটের রেজাল্ট বেরোল ২০০৯ এর জুনে, স্বাভাবিকভাবেই পাশ করিনি। ২০০৯ এর জুনের শেষ রবিবার আবার এই ষাণ্মাসিক উৎসবে যোগ দিলাম। এবার উৎসব স্থল রাজাবাজার। দ্বিতীয়বার যাদবপুরের অকৃতকার্য নেট পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা হলো, একটু ভাব হল, একটা সংহতি তৈরি হল। ব্যর্থতার ঐক্য। নেট পরীক্ষা দিয়ে আবার দেখা হবে বলে সবাই বিদায় নিলাম। যদিও জানতাম এর মধ্যে কেউ কেউ আর পরেরবার এই উৎসবে থাকবে না, আমাদের ছেড়ে চলে যাবে! নেট পাশ করে। ঠিক এই সময় থেকে নেট পরীক্ষাটাকে কেমন ভালবেসে ফেললাম। বুঝে গেছিলাম এর সঙ্গে অনেকদিন আমাকে ঘর করতে হবে। খুব সহজে আমাদের বন্ধন টুটবে না।  

নাহ! এই নেটেও আমি পাশ করিনি। পরের নেট ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ রবিবার। এবারে হায়দ্রাবাদ থেকে। ওসমানিয়া ইউনিভার্সিটি সেন্টার। হায়দ্রাবাদ ইউনিভার্সিটি থেকে আমাদের জন্য বাসের ব্যবস্থা করা হতো। আমরা বাস ভর্তি হয়ে সবাই পরীক্ষা দিতে যেতাম। সেকেন্দ্রাবাদ পিজি কলেজে পরীক্ষার সিট পড়েছে। ভালই লিখছিলাম কিন্তু হাতে ঘড়ি ছিল না বলে টাইম ঠিক ম্যানেজ করতে পারিনি। জানুয়ারি মাসে বাড়ি এলে আমার দিভাই আমাকে একটা ঘড়ি উপহার দেয়। ঐ ঘড়িটা আমার খুব প্রিয় ছিল। ইতিমধ্যে আমার জীবনের প্রথম নেট, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসের নেটের মার্কস প্রকাশিত হয়েছে। আমি তখন উল্লাসে সপ্তম স্বর্গে। একটি এডমিট কার্ড আর একটি পেন, -এই সম্বল করে আমি প্রথম নেট দিতে যায়, আর সেই প্রথম নেটেই কিনা আমি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রে কুয়ালিফাই করে গেছি! তৃতীয় পত্র দেখা হয়েছে! এবং আমি তৃতীয় পত্রে ৬৮ নম্বর পেয়েছি। আমি সব প্রশ্নের উত্তর লিখতে পারিনি, কিছুই জানতাম না, তবু এতো নম্বর পেয়েছি! তার মানে নেট বেশ সহজ পরীক্ষা। সেই আমার মধ্যে এক অদ্ভুত জোর তৈরি হলো, যে “ইয়েস ! আমি নেট পাবো। পাবোই”। 

কিন্তু নেট-কে সহজ ভেবেই ভুল করেছি। যে মানুষ খুব সহজে কাছে আসে, আপন হয়, ধরা দেয়, তার গভীরতা যেমন বুঝি না! যেমন বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ পুকুরের মতো, উপরের জল স্থির বলে তাকে সহজ ভেবে গভীরতা ঠাউর করা যায় না, তেমনই। এর ফল পেলাম পরবর্তী দুটি নেট -এ। ২০০৯ -এর জুনে আমি প্রথম পত্র ও দ্বিতীয় পত্রেই কুয়ালিফাই করতে পারিনি এবং মজার ব্যাপার ২০০৯ -এর ডিসেম্বরের নেটে প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রে কুয়ালিফাই করতে পারলেও তৃতীয় পত্রে আরও কম নম্বর পাই। ইতিমধ্যে আমি যেহেতু হায়দ্রাবাদে পৌঁছে গেছি এবং অধ্যাপক টুটুন মুখার্জী এমফিল -এ আমার কো-সুপারভাইজার, এবং তিনি আমাকে একেবারে সন্তান স্নেহেই দেখতেন, ফলত আমার নতুন করে নিজেকে তৈরি করার পর্ব শুরু হলো। কোনো বইপত্র দরকার হলে তিনি বলতেন তাঁকে জানাতে, তিনি কিনে নিয়ে আমাকে দিতেন। নেটের জন্য প্রয়োজনীয় সব বই, হ্যাঁ, সব বই ওঁর থেকে পেয়ে গেলাম। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ জানলাম উলরিখ উইজস্টেন, পরে এই বইটির কপি আমি আমার বন্ধুদের ও ছাত্রছাত্রীদের দিয়েছি। আর আমাদের কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে আমি জোগাড় করেছি সুসান ব্যাস্নেট। বইটির ফটোকপি আমার কাছে এখনও আছে, ঐ বইটিই আমার জীবনে পাওয়া তুলনামূলক সাহিত্যের প্রথম বই। তার সঙ্গে সংগ্রহ করেছি, অরবিন্দ পোদ্দার সম্পাদিত ইন্ডিয়ান লিটারেচার, ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব এডভ্যান্স স্টাডিজ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এই বইটাও আমি পুরোটাই ফটোকপি করে নিয়েছিলাম। ম্যাম আমাকে আরও দিয়েছিলেন রেঁনে ওয়েলেক আর অস্টিন ওয়ারেন, হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে পেয়ে গেলাম জেরিমি মান্ডী, ইউজিন নাইডা আর কোর্স ওয়ার্কে পড়ছি লরেন্স ভেনুতি, এন্দ্রে লেফেবর কিছুটা পড়েছি, তামিল কাব্যতত্ত্ব ও সঙ্গম সাহিত্য সম্বন্ধে কিঞ্চিত এই সময়েই পড়ি । ফলত প্রস্তুতি এমন হয়েছে যাতে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়ে গেছে। আর উপলব্ধি করেছি, নেট সহজ নয়। ২৬ টি প্রশ্নের উত্তর লিখতে হবে থার্ড পেপারে। ফার্স্ট ও সেকেন্ড পেপারে পাশ করা অনেকটাই আমার হাতে, এটা আমার মনে হয়েছিল। সাহিত্য ও সাধারণ জ্ঞান দুটোতেই একটা ধারণা ছিল, জানতাম যে প্রথম দুটো পেপার কুয়ালিফাই না করতে পারলে, নিছক তা আমার পরীক্ষার হলে বসে কিছু ভুলের কারণেই হবে।     

আমার এমফিল শুরু হয়ে গেছে। ক্লাসের চাপ, পড়াশুনোর চাপ, এবং একাধিক সেমিনার/কনফারেন্সে আমি তখন পেপার প্রেজেন্ট করছি দেশের নানা প্রান্তে। ২০১০ -এর ৩০ শে জুন আমার এমফিল জমা দেওয়ার শেষ দিন। আর সম্ভবত ২৭/২৮ জুন ছিল নেটের দিন। একদিকে সারারাত জেগে কাজ, অন্যদিকে নেটের প্রস্তুতি। নেট পরীক্ষা খুবই ভালো হলো। এই প্রথম আমি থার্ড পেপারের ২০০ নম্বরেরই উত্তর দিয়ে আসতে পারলাম। কিন্তু ফার্স্ট পেপারে কম্প্রিহেনশন সব শেষে করতে গিয়ে একেবারে প্যাসেজে থাকা স্পষ্ট উত্তর ভুল করে এলাম। ঠিক দু’নম্বর, অর্থাৎ একটি প্রশ্নের জন্য আমার দুটি পেপারের কুয়ালিফাই করার প্রয়োজনীয় নম্বর উঠলো না। সেকেন্ড পেপারে আমি অনেক বেশি পেয়েছিলাম, দুটো পেপার মিলিয়ে আমাদের ১০০ পেতে হতো, কিন্তু এক একটি পেপারে ৪০ করে পেতে হতো। কিন্তু ফার্স্ট পেপারে আমি পেলাম ৩৮ অথচ দুটি পেপার মিলিয়ে একশ’র বেশি। খুব মন খারাপ হল, এত ভালো থার্ড পেপারের পরীক্ষা কি আর কখনও হবে! এই নেটেই আমার জেআরএফ হয়ে যেত, একেবারে পিএইচডি শুরু থেকেই তাহলে ফেলোশিপ পেতাম! খুব, খুউব আফসোস হলো। 

২০১০ -এর ডিসেম্বর, এবারেও বেশ ভালো হলো পরীক্ষা, কিন্তু থার্ড পেপারে ২০০ নম্বর উত্তর করতে পারলাম না। ১৭৫ নম্বর উত্তর করতে পারলাম এবং সময়ের অভাবে কম্প্রিহেনশনের ২৫ নম্বর উত্তর দিতে পারলাম না। এবারও ফিরে এলাম গভীর হতাশা নিয়ে। প্রথম দুটি পেপারে পাশ করলেও থার্ড পেপারের জন্য এবারও নেট পাব না। আমাদের একটি নেটের রেজাল্ট পরের নেটের দু’একদিন আগে প্রকাশিত হতো। এখনকার মতো নম্বর দেওয়া বা উত্তরপত্র মেলানোর বিষয় ছিল না। জুন ২০১১ -এর নেটের ফর্ম ফিলাপ করেছি। আর জুন মাসের নেটের ঠিক কদিন আগে ডিসেম্বর ২০১০ নেটের ফল প্রকাশিত হলো। রোল নম্বর মিলিয়ে একটি লম্বা পিডিএফ থেকে নিজের নম্বর আছে কিনা দেখতে হতো। যেহেতু সব বিষয় একই পিডিএফ এ থাকত ফলত একটি বিষয়ে কতজন নেট বা জেআরএফ পেলো একটু খোঁজাখুঁজি করলেই পাওয়া যেত, সেন্টার কোড আর সাবজেক্ট কোড দিয়ে। 

এডমিট কার্ড -এ লেখা থাকত রোল নম্বর, একটি পেনের কালিতে হাতের লেখায়। সেটাই একমাত্র সম্বল। তবে ২০১০-২০১১ থেকে অনলাইন এপ্লিকেশন শুরু হয়ে গেছিল। প্রিন্ট আউট নিয়ে সেন্টারে জমা দিতে হতো। ফর্মের কাউন্টার পার্ট রোল নম্বর হিসাবে হাতে থাকত। যত্ন করে রাখতে হতো নেটের এডমিট কার্ড। আমি নেট পাশ করলাম। সেই আনন্দের আনুভূতি বলে বোঝানো যায় না। আমার মাস্টারমশাই অধ্যাপক বিমল মুখার্জিকে ফোন করে জানিয়েছিলাম। উনি আমাকে বলেছিলেন, “তুমি আমাদের স্বপ্ন আর লড়াইয়ের সার্টিফিকেট”। নেটের সার্টিফিকেট কবে আসবে জানি না! উনি আরও বললেন, “তুমি আমাদের অপরাধী করে দিচ্ছ। এই যে জাতীয় স্তরের পরীক্ষায় পাশ করে এমফিল করছ, নেট পাশ করলে, কিন্তু তোমাকে চাকরি কে দেবে, আমি কি আর কিছু করতে পারব তোমার জন্য”! নেট পাশ করার আনন্দে আমি সেসব কথায় কেবল উৎফুল্লই হচ্ছি। প্রথম ফোন  মা -কে, তারপর দিভাইকে, তারপর স্যার-কে, স্যার মানে বিশ্বনাথ বাবু, তারপর ম্যাম-কে, মানে টুটুন মুখার্জি-কে, তারপর বিমল বাবুকে। বিশ্বনাথ বাবু স্বভাব গম্ভীর মানুষ, শুনে বলেছিলেন, “ভালো – এবার জেআরএফ পাওয়ার চেষ্টা কর।” 

(চলবে)

বৃহস্পতিবার , মে ১১, ২০২৩

মৃন্ময় প্রামাণিক

Scroll to Top